প্রধান বিচারপতি সিনহার অসুস্থতা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

সিলেট বিভাগ
ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান : বেশ কয়েকদিন আগেই ‘প্রধান বিচারপতির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম বিচার বিভাগ নিয়ে যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সামনের দিনগুলোতে চলার পথ মোটেই মসৃণ হবে না। সরকারের আচরণের দিক বিবেচনায় যা বলার চেষ্টা করেছিলাম তা যেন আজ বাস্তবে রূপ নিল।
সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা যেভাবেই বলার চেষ্টা করুক না কেন, প্রধান বিচারপতি সিনহা অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে স্বেচ্ছায় একমাসের ছুটিতে গেছেন, তা কোনোভাবেই দেশবাসীকে বিশ্বাস করানো যাবে না। কেননা, দেশবাসীর মনে এই অবিশ্বাস আর সন্দেহ সরকার পক্ষই সৃষ্টি করেছে।
এইতো কয়েকদিন আগে প্রধান বিচারপতি বিদেশ সফর করে আসলেন। দেশে ফিরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। যথারীতি একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও দেখা করলেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানেও গেলেন একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে। হঠাৎ তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গেলেন, এমন অসুস্থ হলেন যে জরুরি ভিত্তিতে তাকে কোনো হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়নি।
 
ধরেই নিলাম তিনি অসুস্থ এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু আইনমন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে হলো কেন, দেশে কি কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই? এর আগে প্রধান বিচারপতি সিনহা এমন জটিল রোগে আক্রান্তের খবর কোনোদিন তো শোনা যায়নি। এমন কি বিচারপতি সিনহা দেশ-বিদেশের কোনো হাসপাতালে এমন রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে এমন তথ্যও আমাদের জানা নেই। ক্যান্সার রোগটি এমন এক মরণব্যাধি যার তড়িত চিকিৎসা না করালে স্বল্প দিনের ব্যবধানেই মানুষ মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন। এমন এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েও তিনি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন না, এমন কী বিদেশে গিয়েও বিনা চিকিৎসায় ফিরে আসলেন!  সবকিছুই কেমন যেন এলোমেলা।
 
এছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগে এতো তড়িঘড়ি কেন? কোনো দেরি না করে রাতের আঁধারেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। এসব কিসের ইঙ্গিত? সঙ্গত কারণেই দেশবাসীর ন্যায় আমার মনেও প্রবল সন্দেহ জাগছে- ভেতরে ভেতরে একটা কিছু ঘটছে।
 
কেউ স্বীকার করুক আর নাইবা করুক, এটা সত্য যে- প্রধান বিচারপতি সিনহা আজ কঠিন পরিস্থিতির শিকার। নিজে সুস্থ না অসুস্থ সে কথাও তিনি কাউকে জানাতে পারছেন না। তার সঙ্গে কাউকে দেখা করারও সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। ফলে সহজেই অনুমেয় পরিস্থিতি কতটা জটিল। আর আমাদের দেশের মানুষ এতটা বোকা নন যে সরকার যা বলছে তাই বিশ্বাস করে নিচ্ছেন।
ইতোপূর্বে আমাদের দেশের আদালতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায় হয়েছে, কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মতো আর কোনো রায় ইতোপূর্বে এতো উত্তাপ ছড়িয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে এই রায়কে দলবাজ লোকেরা যেভাবেই বিবেচনা করুন না কেন, সার্বিক বিবেচনায় দেশের ইতিহাসে এটি একটি ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়’। এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে ধরনের সাহস দেখিয়েছেন তাতে ভূয়সী প্রশংসার যোগ্য।
 
বিচারবিভাগের ইতিহাস ঘেটে যা জানা যায় তাতে, এ ধরনের একটি সাহসী রায় দিয়ে এসকে সিনহা সাম্প্রতিকালের শ্রেষ্ঠ বিচারকের সুনাম কুঁড়িয়েছেন। পাকিস্তান আমলের বিচারপতি মোর্শেদ যেমন যুগান্তকারী রায় দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন তেমনি সিনহা সাহেবও। যদি না তিনি কোনো আপোস করেন।
 
সামনে দুটি পথই খোলা আছে- নির্বাহী বিভাগের আপস করে নতি স্বীকার করা কিংবা কোনো ধরনের চাপে নতি স্বীকার না করে দেশের বিচারবিভাগকে অনন্য মর্যাদায় মর্যাদাশীল করা।
 
প্রবীণ নাগরিকদের স্মরণে থাকার কথা, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদের সাহসিকতার কথা। তার কিছু ব্যতিক্রমধর্মী রায়- দ্য মিনিস্টার কেইস, দ্য প্যান কেইস, দ্য বেসিক ডেমোক্রেসি কেইস, দ্য মাহমুদ কেইস এবং দ্য কনভোকেশন কেইস প্রভৃতি যা পাকিস্তানে সাংবিধানিক ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক বিচারপতি হিসেবে দেওয়া তার একটি রায়কে ‘লিগ্যাল ক্ল্যাসিক’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
 
তার প্রবাদসম সাহসিকতা ও প্রচণ্ড সাহসী রায় তৎকালীন সরকারকে ঘাবড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সরকার বিভিন্নভাবে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল।কিন্তু বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ। যখন দেখেছেন তিনি বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে বিচার করতে পারছেন না, প্রধান বিচারপতির পদ থেকে নিজেই পদত্যাগ করে ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর দেশের গণমানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
 
এরপর ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের কৌঁসুলি স্যার টম উইলিয়ামসের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।বিচারপতি মোর্শেদের জ্ঞান ও আইনের শাসনের প্রতি সমর্থন দেখে টম উইলিয়ামস বহুবার প্রশংসা করেছেন তার। আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৬৯) সমগ্র পাকিস্তানের যে ৩৫ জন নেতা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিচারপতি মোর্শেদ । প্রধান বিচারপতি থাকাকালে নিম্ন আদালতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি রাজনীতিবিদদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এছাড়া উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফলে নানা কারণেই ইতিহাসের পাতায় আজ তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা।
 
ফলে সাম্প্রতিককালে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আইনগত দিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রায়ের পর্যবেক্ষণগুলোও আরো বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ। আর এই রায়কে ঘিরে সরকারে অস্বস্তি ও বিরোধী শিবিরে উচ্ছ্বাস। যদিও এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়,এবং আইনের দৃষ্টিতেও তাদের প্রতিক্রিয়া অর্থহীন। তবে সমস্যা হচ্ছে রায়কে ঘিরে শাসন ও বিচার বিভাগের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের বিষয়টি।
 
যতদূর জানা যাচ্ছে তাতে, রায়কে নিয়ে যতটা না রাজনীতিবিদদের উদ্বেগ তার চেয়ে বেশি রায়ের পর্যবেক্ষগুলোকে ঘিরে। সরকার ও বিরোধী পক্ষে চলছে তুমুল বাকযুদ্ধ। আদালতের রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে তাতে সরকারে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আর এতে সরকার যে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে তা মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের বক্তব্য থেকেই দৃশ্যত হচ্ছে। সরকার পক্ষ এ রায়ের সমালোচনা করলেও বিরোধী পক্ষ এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করে।
 
তবে রায়ে সংক্ষুব্ধ সরকার। এমন কী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী-এমপি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে কথা বলছেন। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল জরুরি সভা করেও এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। আওয়ামী লীগের আইনজীবী পরিষদও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সবমিলেই রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। রায় ঘোষণার পর থেকেই প্রধান বিচারপতি ওপর নানাভাবে সরকারের চাপ ছিল। এধরনের চাপ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজীরবিহীন। ইতোপূর্বে এমনটি হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
 
এখন দেখার বিষয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আগামী দিনে বিচারবিভাগের মান-মর্যাদা রক্ষায় কতটা সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেন। চাপের মুখে নতি স্বীকার করে তিনি নীরবে বিচারবিভাগকে কলঙ্কিত করে যাচ্ছেন, না সাহসের সঙ্গে ভূমিকা রেখে বিচার বিভাগকে অনন্য মর্যাদায় রেখে যাচ্ছেন। এটা জাতির জন্য টার্নিং পয়েন্ট বলা যেতে পারে- কেননা, প্রধান বিচারপতি সিনহার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে আইনের শাসন থাকবে কি থাকবে না। তা দেখতে অবশ্য আমাদেরকে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply