ভাস্কর্য অপসারণ-পুনস্থাপন ইস্যুতে একূল ওকূল দুকূলই হারাচ্ছে আ,লীগ

প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০১৭

ভাস্কর্য অপসারণ-পুনস্থাপন ইস্যুতে একূল ওকূল দুকূলই হারাচ্ছে আ,লীগ

দ্বৈত্যনীতিতে ক্ষুব্ধ বাম-হেফাজত!

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে ভাস্কর্য (মূর্তি)সরানো ও পুনস্থাপনের ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম ও বাম দলগুলো নাখোশ। এটা কোনো পক্ষকেই খুশি করতে পারেনি। পরস্পর বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী দু’পক্ষই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পৃথক দাবিতে কঠোর আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছে। বাম-ডান ঘরনার বুদ্ধিজীবীরাও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ। ফলে ধারণা করা হচ্ছে এ ঘটনায় একূল ওকূল অর্থাৎ দুই কূলই হারাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে বৈঠকের পর হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ও তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। এ ঘটনায় বাম দলগুলোর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন বাম দলের নেতারা। এটাকে তারা সরকারের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতি মনে করছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়ায় খুশি হলেও সেটি আরেক জায়গায় পুনঃস্থাপনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হেফাজত আমির শাহ আহমদ শফী।

ভাস্কর্যটি পুনঃস্থাপনকে ‘জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সাথে তামাশা’ বলে মন্তব্য করেছেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির প্রধান।

সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্যটি অপসারণের পরদিন শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুকরিয়া মিছিল করে ইসলামী দলগুলো।

তার একদিন পরে রবিবার এক বিবৃতিতে হেফাজত আমির বলেন, ‘দেশবাসী যখন পবিত্র রমজানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই জানা গেল সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে মূর্তি পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। এমন সংবাদে সমগ্র দেশবাসীর সঙ্গে আমরা বিস্মিত, হতবাক ও বাকরুদ্ধ।’

ওই ভাস্কর্য দেশ থেকে চিরতরে অপসারণের দাবি জানিয়ে শফী বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম গ্রিক দেবীর এই প্রতীককে চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। এই ভাস্কর্য, যা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্থাপিত হয়েছিল, তাকে বাংলাদেশের কোথাও স্থান দেওয়া যাবে না।’

গণভবনে ওই বৈঠকেই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

‘অথচ আমাদের সকল আবেদন-নিবেদন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন প্রমাণ করে, এদেশের মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষাকে সরকার বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে রোমান যুগের ন্যায়বিচারের প্রতীক ‘লেডি জাস্টিস’ এর আদলে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হলে হেফাজতসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠন এর বিরোধিতায় নামে।

সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে এই জায়গায় ছিল ভাস্কর্যটি, এখন ওইখানটা ফাঁকা।

ওই ভাস্কর্য অপসারণ করা না হলে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের ঘটনার মতো আবারও ঢাকা অচল করে দেওয়ার হুমকি দেয় তারা। এরপর গত ১১ এপ্রিল হেফাজতের আমির শফী নেতৃত্বাধীন একদল ওলামার সঙ্গে গণভবনে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাস্কর্যটি সরাতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হয়। একে ‘নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ’ আখ্যায়িত করে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠন। দেশের বাম ঘরনার শীর্ষস্থানীয় লেখক, অধ্যাপক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীরাও এর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনে থেকে ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মৌলবাদী শক্তি আরও সংহত এবং তারা রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে চাপ তৈরি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এই শঙ্কা জানানোর দুই দিনের মাথায় ভাস্কর্যটি পুনঃস্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে হেফাজতের পাঠানো বিবৃতিতে ‘বাস্তবতা বুঝে’ সিদ্ধান্ত নিতে সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভাস্কর্য অপসারণে ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং সেটি আগের জায়গায় পুনঃস্থাপনের দাবিতে নানা কর্মসূচির মধ্যে শনিবার রাতে সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে ভাস্কর্যটি বসানো হয়।

এখন হেফাজত আমির শফী বলছেন, ভাস্কর্য অপসারণে ‘মধ্যপন্থা’ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

‘এটি সামনে না পেছনে থাকবে, সেটি ইস্যু ছিল না। ইস্যু ছিল এটি থাকা না থাকা। ইসলামে ইনসাফ বা ন্যায়ের ধারণা একটি মৌলিক ধারণা। ইনসাফ কায়েম ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যও।’

‘নাগরিকদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আমাদের জাতীয় চেতনা ও ঐতিহ্য নিয়ে তামাশা বন্ধ করে ভাস্কর্য (গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি) চিরতরে দেশ থেকে অপসারণ করতে হবে।’

এদিকে বামদলগুলো চেয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্যটি যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। সেটি সরানো হবে না। কিন্তু সেটি সরানোর জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। হেফাজতকে আশ্বাস দিয়েছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকারের এই বিষয়ে কথা বলার কথা নয়। এরপরও বলেছে। ভাস্কর্যটি কেন সরানো উচিত এবং ওই ভাস্কর্য নিয়ে সমালোচনাও করেছে। এরপরও তারা চেয়েছে সেটি থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি সরানো হয়েছে। এতে তারা ক্ষুব্ধ।

বাম দলের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তারা মনে করে সরকার হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে এই ধরনের উদ্যোগ নিবে এটা তারা ভাবতে পারেনি। ভাস্কর্যটি সরানোর কারণে বামদলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে তা কিছুটা প্রমাণিত হয় যখন ভাস্কর্যটি এ্যানেক্স ভবনের সামনে পুন:স্থাপন করা হয়েছে। হেফাজত বলেছে সব ভাস্কর্য অপসারণ করতে হবে। আবার এ্যানেক্স ভবনের সামনে স্থাপনের বিষয়টি তারা ইতিবাচকও ভাবে নেয়নি। সব মিলিয়ে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ককে ভালভাবে নিচ্ছে না বামদলগুলো।

সরকারের ভিতরে থেকেও সমালোচনা করা হচ্ছে। প্রকাশ্যেই দু’একজন মন্ত্রী কথা বলেছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সমঝোতা করে রাজনীতি করলে সেটা আত্মঘাতি হবে। আশা করি, আওয়ামী লীগ হেফাজতের সঙ্গে কোনোরূপ সমঝোতার রাজনীতি করবে না। হেফাজতের তেঁতুল হুজুররা সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতির জিকির তোলার চেষ্টা করছে, তাদের সঙ্গে উঠা বসা করা গণতন্ত্রের জন্য হবে আত্মঘাতি।

বাম দলের অনেকেই মনে করেন, ভাস্কর্যের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ভাস্কর্য স্থাপন করা মূর্তি পুজা নয়, ভাস্কর্য হচ্ছে শিল্প মাধ্যম। হেফাজতে ইসলামের তেঁতুল হুজুররা সকল ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

মূর্তিটি অপসারণ করায় হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলো শুকরিয়া আদায় করে সরকারকে ধন্যবাদ জানায়। ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার রাতে এবং শুক্রবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের সামনে বিক্ষোভ করে বামপন্থী কয়েকটি সংগঠন। এ সময় পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষও হয়। একই দাবিতে তারা আবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ করে।

শুক্রবার বাম ছাত্র নেতারা টিএসসি থেকে মিছিলসহ কারে এসে সুপ্রিম কোর্টের সামনে মাজার গেট এলাকায় বিক্ষোভ করে। পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীসহ চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে তারা অভিযোগ করেন। তাদের মুক্তির দাবিতে শাহবাগ থানার সামনেও বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা।

ঘটনার পর সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এবং বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান এক যৌথ বিবৃতি বলেছেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির তথাকথিত আন্দোলনের হুমকিতে ভীত হয়ে সরকার হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য অপসারণ করে। যা বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে নতি স্বীকারেরই নিদর্শন।

তারা বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য সমর্থনের আশায় বর্তমান সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপসের যে পথে গেছে তা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনছে। তারা সরকারের সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে নতি স্বীকারের যে রাজনীতি তাকে রুখে দেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানান।

বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান দলের পক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ন্যায়বিচারের প্রতীকী ভাস্কর্য সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রাতের অন্ধকারে কাজটি করা হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম, আওয়ামী ওলামা লীগসহ ধর্মান্ধ, ধর্মব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ফিকিরবাজ সংগঠন ও সংস্থার দাবি ও চাপে শাসক দল ভোটের সমীকরণে প্রতারণামূলক কৌশলে এ কাজ করিয়েছে। পায়ের তলা থেকে সরে যাওয়া মাটি ভরাট করতে যেকোনো আবর্জনার ওপর দাঁড়াতেই আজ আর শাসকদের বাধছে না।

তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করে এবং ২০ ভাগ থেকে ৯ ভাগ জনগোষ্ঠীতে নেমে আসা সংখ্যালঘুদের ওপর নির্ভর করে, সর্বোচ্চ দরে ভোট কেনা-বেচার পসরা সাজিয়েও যখন ভোটের বাক্সের এক কোণা ভর্তি করা যাবে না নিশ্চিত হয়েছেন, তখনই তারা মৌলবাদী আর মুসলিম পার্থক্য রেখা ঘুচিয়ে বড় ভোট ব্যাংক হাসিলে ধর্মান্ধ শক্তির একটি বড় অংশকে মাঠে নামানোর পথ ধরেছে।

ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক বলেছেন, মধ্য রাতে অতি গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্যটি হাতুড়ির আঘাতে ভেঙে ফেলার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধকামী জনগণের হৃদয় ভেঙে দেয়ার নামান্তর। বাংলা বর্ণমালা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয়ের বহুমাত্রিক সংগ্রামে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র জনগণের এক রক্তাক্ত মুক্তিসংগ্রাম দেশ দুনিয়া কাঁপিয়েছিল। এ কথা মুক্তিযুদ্ধের অনুসারীরা অস্বীকার করবেন কোন মুখে? সাম্প্রদায়িকতাবাদী হেফাজতের কথিত মূর্তি যা বিশ্বজুডে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য তা অমর্যাদার সাথে অপসারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয় ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের প্রতি নতি স্বীকার।

এদিকে ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদে আন্দোলনে অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছেন ও মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি বাম নেতারা।

এছাড়াও সরকারকে দ্বৈতনীতি পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার আহবান জানান অন্যথা, এর জন্য চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন নেতারা।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট