সিলেটে ‘চা শ্রমিক দিবস’ পালিত

প্রকাশিত: ৬:৪৫ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০১৭

সিলেটে ‘চা শ্রমিক দিবস’ পালিত

২০ মে চা শ্রমিক দিবস। আজ থেকে ৯৬ বছর আগে ১৯২১ সালে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা বৃটিশ মালিক শ্রেনীর সীমাহীন শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক পন্ডিত দেওশড়ন ও গঙ্গাদয়াল দিক্ষিতের নেতৃত্বে নিজ মুল্লুকে ফিরে যেতে চেয়েছিল। রেল লাইনের রাস্তা ধরে মেঘনা ঘাটে পৌছলে এবং জোড় করে স্টিমারে উঠতে চাইলে বৃটিশ সরকার এবং মালিক পক্ষের লেলিয়ে দেয়া গোর্খা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায় এবং শতশত চা শ্রমিককে হত্যা করে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ইতিহাসে এই আন্দোলন “মুল্লুকে চল” আন্দোলন নামে খ্যাত। এই নৃশংশ হত্যা ঘটনার প্রতিবাদে ট্রেন কর্মচারীরা প্রায় ৩ মাস ধর্মঘট পালন করে এবং গঙ্গা দয়াল দিক্ষিত অনশন করে জেলে মারা যান। এই ঘটনা বৃটিশ সরকারের মসনদে আঘাত করে। এই দিবসকে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে পালন করে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন। শনিবার সকালে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পন করা হয় মালনীছড়া, তারাপুর, লাক্কাতুরা, হিলুয়াছড়া, ছড়াগাঙ, বড়জান, খান বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে। বিকাল ৪টায় মালনীছড়া বাগানের শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের মালনীছড়া শাখার আহবায়ক সন্তোষ বাড়াইক ও অজিত রায়ের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ (মার্কসবাদী) সিলেট জেলার আহবায়ক কমরেড উজ্জ্বল রায়, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন সিলেট জেলার সভাপতি সুশান্ত সিনহা, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক হৃদেশ মুদি, লাংকাট লোহার, সন্তোষ নায়েক প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বৃটিশ গেল, পাকিস্থান হল, মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার চা শ্রমিক সন্তানেরা জীবন দিল, শতশত মা বোনেরা ইজ্জত দিল কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ পেল না। আশা ছিল দেশ স্বাধীন হলে ন্যায় সঙ্গত মজুরী পাবে। সন্তানদের শিক্ষা, এদেশে মাটির অধিকার পাবে। সর্বোপরি এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে গর্বের সাথে মাথা উচু করে দাড়াতে পারবে। কিন্তু সেই আশা গুড়ে বালি। স্বাধীনতার ৪৬ বছর গত হয়েছে এখনও ন্যায় সঙ্গঁত মজুরী নেই, ফলে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকলেও সস্তা দরে সরকার অনুমোদিত মদের পাট্টা আছে। শতশত বছর ধরে এই মাটিতে বসবাস করে আসলেও এই মাটির উপরে চা শ্রমিকদের কোন আইনগত অধিকার নেই, ফলে এখন চা-শ্রমিকরা আমদানী করা রিফুউজির মতো ঠিকানা বিহিন ভাবে ভাসছে। অথচ সব গুলো অধিকারই সংবিধান স্বীকৃত বিষয়। ভূমিতে আইনগত অধিকার না থাকায় কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে হবিগঞ্জের চান্দপুর ও বেগমখান বাগোনের ৫১১ একর জমি সরকার ইকোনমিক জোনের নামে বরাদ্দ দেয়ার পায়তারা করছে। ইতিপূর্বে লাক্কতুরা বাগানে স্টেডিয়াম করা হয়েছে।
চা বাগানের লিজের শর্ত অনুযায়ী ঘরবাড়ি, পয় নিষ্কাষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, গোসলখানা, খেলাধুলা ও চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা চা বাগান কর্তপক্ষের করার কথা থাকলেও তা শুধু কাগজে কলমে, বাস্তবে তা পাওয়া যায় না। মালিকরা চা শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেবে বলে সরকারের কাছ থেকে কম মূল্যে বাগান লিজ আনে অথচ সেই সুযোগ সুবিধা চা শ্রমিকদের দেয় না। দুর্মূল্যের এই বাজারে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী ৮৫ টাকা। চা শ্রমিকরা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরীরর দাবিতে দীর্ঘদীন ধরে আন্দোলন করলেও মালিকপক্ষ তা মানতে নারাজ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকার যে অধিকার গুলো দেওয়ার কথা সরকার তা দিচ্ছে না। মালিক পক্ষ থেকে ঘোষিত অধিকাংশ শর্ত মালিকরা পূরণ করছে না। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা জানি অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই অধিকার আদায় করে নিতে হয়। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন তার জন্ম লগ্ন থেকেই ন্যায় সঙ্গত মজুরী প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, চা শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী আইন বাতিল, চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার এবং ২০ মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন ও সবেতনে ছুটি প্রদানের জন্য আন্দোলন করে আসছে। যত দিন পর্যন্ত শ্রেনী সচেতন আদর্শিক ও ত্যাগী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবেনা ততদিন পর্যন্ত চা শ্রমিকদের মুক্তি আসবেনা। তাই নেতৃবৃন্দ চা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার আহবান জানান।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট