সাগরে পরিণত হয়েছে শনির হাওর

প্রকাশিত: ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০১৭

সাগরে পরিণত হয়েছে শনির হাওর

সুনামগঞ্জ : শেষ রক্ষা হলো না সুনামগঞ্জের বৃহৎ শনির হাওরের। হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে শনির হাওরে প্রবল বেগে হাওরে পানি প্রবেশ করায় হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। গোটা শনির হাওর যেন এখন সাগরের মতো ঢেউয়ে উত্তাল।

গত কয়েকদিন থেকে শনির হাওর পাড়ের কৃষকরা পানির সাথে লড়াই করে হাওরটির বাঁধ ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। যাতে হাওরটির ফসল রক্ষা হয়। কিন্তু তাদের সব পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা মিশে গেল বানের পানির সাথে। এভাবেই তলিয়ে গেছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন। টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা।

কৃষক শুধু ফসল হারিয়েই সর্বস্বান্ত হয়নি, হাওরের মাছ, হাঁস মরে যাচ্ছে। প্লাবিত হাওর এলাকায় দেখা দিয়েছে পানিবাহী রোগ। সুপেয় পানির অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। পানির দুর্গন্ধে মানুষ এলাকায় টিকতে পারছে না। অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সেই সাথে প্লাবিত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকাকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণার দাবি আরো জোরালো হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এসব এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করা হয়নি। এতে করে বিস্তীর্ণ হাওরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

সুনামগঞ্জের অধিবাসী সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আলী আব্বাস বলেন, এখানকার মানুষ খুবই অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। এই দুর্যোগ কাটিয়ে তুলতে সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে প্লাবিত হাওর এলাকাকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করা। তিনি বলেন, হাওর এলাকার যেসব কৃষক ও জেলেরা ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ এবং মাছ চাষ করেছিল- তাদের ঋণ মওকুফ করে দেয়া হোক। সেই সাথে নতুন করে করে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা দেয়া হোক হাওর এলাকার কৃষক ও জেলেদের।

পরদিকে অতিবৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ব্যাপক পাহাড়ী ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রবিবার পানি সম্পদমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করেছেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়- বাঁধ ভেঙে হাওরের মানুষের দুর্গতির পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে কী না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান বিপদে এ থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া আমাদের করার কিছু নেই। হাওরে বাঁধ ভাঙার পেছনে যে পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতির কথা পত্রিকায় লেখা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তার মতে, বাঁধের ১ থেকে দেড় মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হলে তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা পাউবো’র নেই।

এ বছর বাঁধ মেরামতের জন্য ৮২০টি জায়গা চিহ্নিত করা হয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এসব চিহ্নিত জায়গার মধ্যে ধান কাটার পর পানি নামার জন্য এবং নৌকা দিয়ে ধান নেয়ার জন্য স্থানীয় জনগণ ৫২০টি জায়গার বাঁধ কেটে দেয়। কেটে দেয়া এসব জায়গাসহ প্রায় ৪০টি নদীর মুখ বাঁধতে হয়। কিন্তু এবছর পিএসই কিছু কাজ জানুয়ারির শুরুতে দিলেও অনেক কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয় ফেব্রুয়ারিতে এসে। এতে করে সময় মত বাঁধের কাজ শেষ করা যায়নি। এছাড়াও অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যা দেখা দিয়েছে। একে তিনি জলবায়ুর প্রভাব বলে উল্লেখ করেন।

হাওরাঞ্চলের দুর্বল ও অসমাপ্ত বাঁধ ভেঙে প্লাবন ও ফসলহানির পেছনে বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করে ঢাকায় মানববন্ধন ও সভা সমাবেশ হয়েছে। সুনামগঞ্জের হাওরে ২৮টি বাঁধ নির্মাণ না করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়ার পর ইতোমধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ২৯ শে মার্চ ওই এলাকা প্লাবিত হওয়ার নজির সেখানে নেই। কিন্তু এ বছর ২৯ শে মার্চ থেকে পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত চারদিনে বাঁধের এক থেকে দেড় মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। যার কারণে সেখানে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে।

শনির হাওর পাড়ের কৃষকরা বাঁধ ভাঙ্গার খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে কেউ কেউ কাঁচা ও আধা পাকা ধান কাটছেন। কৃষকরা বলছেন, যেভাবে হাওরে পানি প্রবেশ করছে তাতে মনে হয় না আর ধান কাটার সুযোগ আছে। কারণ,  ২৪ ঘন্টায় সম্পূর্ণ হাওর তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, শনির হাওরে এবার ৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমি আবাদ করা হয়েছিল। সবেমাত্র ধান পাকা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।

শনির হাওর পাড়ের কৃষক মশলঘাট গ্রামের শওকত মিয়া জানান শনিবার রাতেই হাওরে পানি প্রবেশ করা শুরু হয়েছে। হাওর পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে সাদা হয়ে আসছে।এবার আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ একর জমিতে ধান লাগিয়েছিলাম। আশা ছিল আগামী কয়েকদিনে ধান কেটে গোলায় তুলতে পারবো। সে প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। কিন্তু সে আশা পূরণ হলো না। বাঁধ ভাঙ্গার খবর পাওয়ার সাথে সাথে যৎসামান্য ধান কেটেছি। পানি সব ডুবিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বেহলী ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক জানান, আমরা আশায় ছিলাম এবার বোধহয় শনির হাওর টিকে যাবে। সবাই ধান কাটতে পারবে। কিন্তু সে আশা ভঙ্গ হয়ে গেল।

হাওর রক্ষা বাঁধে দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে মাঠে নামে দুদক। দুদকের একটি দল কয়েকজন প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা সরজমিন তদন্তে সুনামগঞ্জে অবস্থান করে। ইতোমধ্যে কয়েকটি হাওর পরিদর্শন করেছেন। দুদক কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেছেন তাদের তদন্ত চলছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পেলেই ত্বরিত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট