স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৪

প্রকাশিত: ১:০৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০১৭

স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৪
রফিক মৃধা : স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৪। নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশার আলোয় রাঙানো নতুন বাংলা বছর শুরু আজ শুক্রবার। সকল না পাওয়ার বেদনাকে ধুয়ে-মুছে, আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শুচি করে তুলতেই আবার এসেছে পয়লা বৈশাখ। : বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। গ্রীষ্মের অগ্নিজিহ্বাও কাল হয়তো বাতাসে লকলক করে নেচে উঠবে। অগ্নিবরণ নাগনাগিনীপুঞ্জও তাদের সঞ্চিত বিষ উগড়ে দেবে বাংলার ভূ-প্রকৃতিতে। তারপরও বাঙালি এই খরতাপ উপো করে মিলিত হবে তার সর্বজনীন এ উৎসবে। দেশের প্রতিটি পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য আর উৎসব মুখরতার বিহ্বলতা। কারণ কাল বাঙালির আনন্দের দিন, পয়লা বৈশাখ। নববর্ষের প্রথম দিনে বদলে যাবে রাজধানী ঢাকার দৃশ্যপট। মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলায় বর্ণবহুল হয়ে উঠবে নগরী। বরাবরের মতই ভোর সোয়া ৬টায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানে ভোরের সুর তুলে শুরু হবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। এর সঙ্গে সঙ্গেই রমনার বটমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডির লেকের পাড়, সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগর, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি অর্থাৎ এক কথায় পুরো রাজধানীই  বৈশাখী আমেজে মেতে উঠবে। কাকডাকা ভোর থেকেই নগরীর পথে ঢল নামবে বাঙালি সংস্কৃতি লালনকারী আনন্দপিয়াসী নগরবাসীর। সবার পরনেই থাকবে বৈশাখী রং লাল-সাদার পাশাপাশি অন্যান্য রঙের বাহারি নকশার পোশাক। নগরীর অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো এবং রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টে কাল থাকবে ইলিশ-পান্তার আয়োজন। বাসাবাড়িতে তৈরি হবে বাঙালি খাবার-ইলিশ মাছভাজা, শুঁটকি-বেগুন-ডাল-আলু-কালিজিরাসহ নানা পদের ভর্তা। আবার অনেকের ঘরে সর্ষে ইলিশও থাকবে। কায়মনে বাঙালি হয়ে ওঠার বাসনা ছাড়া সব কিছুই তুচ্ছ মনে হবে সকলের। : জাতি, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই নয়, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে, সেখানেই বর্ণাঢ্য উৎসবে পালিত হবে পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ উপলে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। নববর্ষ উপলে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। : বাংলা ১৪২৩ সালকে বিদায় এবং নববর্ষ ১৪২৪ বরণকে কেন্দ্র করে তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালা পালন করছে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, এ উপলে সারাদেশই নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। : বর্ষবরণে মূল অনুষ্ঠানসমূহ : বর্ষবরণে রাজধানী জুড়ে আজ শুক্রবার রয়েছে নানা আয়োজন। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ভোর সোয়া ৬টায় শুরু করবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ছায়ানটের দু ঘন্টার আয়োজনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও, নজরুল, লালন গানের একক ও সম্মিলিত পরিবেশনা ছাড়াও থাকবে পাঠ ও আবৃত্তির পরিবেশনা। : এছাড়া সকালে চারুকলার শিার্থীরা বের করবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্ষবরণ উপলে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের আয়োজন দুপুর ২টায় নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এতে বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোহগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত থাকবেন। : জাতীয় প্রেসকাব বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও তাদের সদস্য ও পরিবারদের জন্য প্রাতঃরাশ, দুপুরের খাবার ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। : যেভাবে এলো পয়লা বৈশাখ : ১৯১৭ সালে প্রথম আধুনিক নববর্ষ উদ্যাপনের খবর পাওয়া যায়। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পয়লা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৮ সালেও ছিল একই আয়োজন। ১৯৬৭ সাল থেকে বাংলার এ অংশ ঘটা করে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। : ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। সংগঠনটি গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান জানায়। পয়লা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ  তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। : ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি তোলার মৌসুমে এ নিয়ে ঝামেলা হতো। এতে অসময়ে কৃষকেরা খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতেন। খাজনা আদায় আরও সহজ করতে মুঘল সম্রাট আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। : সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরবর্ষ ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের পঞ্জিকা  তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ (মতান্তরে ১১ মার্চ) থেকে বাংলা সন গোনা শুরু হয়। তবে আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রি.) থেকে এই সনের কার্যকারিতা ধরা হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ নামে পরিচিত হয়। : আকবরের সময়কাল থেকে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা নিজ নিজ অঞ্চলের মানুষকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতে শুরু করেন। এ উপলে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তিত হয়ে এখন এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বইকে বোঝানো হতো। আসলে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সব স্থানেই পুরোনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানিরা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকেন। এই প্রথাটি এখনো বেশ প্রচলিত। : ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদণি করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন ও আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রং- বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পয়লা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। – See more at: http://www.dailydinkal.net/2017/04/14/34035.php#sthash.qbtjUOQW.dpuf

 

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট