আরিফের স্বাক্ষর তিন ফাইলে, বুলবুলের দিন কেটেছে হট্টগোলে

প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩, ২০১৭

আরিফের স্বাক্ষর তিন ফাইলে, বুলবুলের দিন কেটেছে হট্টগোলে

দীর্ঘদিন আইনী লড়াই চালিয়ে রবিবার সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ারে বসেছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী ও মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। কিন্তু ফের বরখাস্তের আদেশে তাদের আর দায়িত্ব পালন করা হয়নি।

আমাদের সিলেট প্রতিনিধি জানান, রবিবার সকাল সোয়া ১১ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত দায়িত্বও পালন করেন আরিফুল।

আরিফুল হক চৌধুরীকে নগরভবনে লালগালিচা সংবর্ধনাও দেয়া হয়।এসময় নগরভবনে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ কাউন্সিলর ও মহিলা কাউন্সিলরবৃন্দ।

শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে মেয়র আরিফ তিন ঘন্টার সময়টাতে তিনটি ফাইলে স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে। ১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দিলওয়ার হোসাইন সজীব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কাউন্সিলর সজীব বলেন- মেয়র তার নতুনভাবে দায়িত্বগ্রহণের সময় প্রাপ্ত সল্প কর্মসময়ের মধ্যে তিনটি ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন। এরমধ্যে একটি হচ্ছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিবের কাছ থেকে দায়িত্বভারগ্রহণ সংক্রান্ত ফাইল, সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থা সংক্রান্ত একটি ফাইল এবং অপরটিও নিয়মিত একটি ফাইল।

এর আগে মেয়র আরিফ সকালে নিজের শুভাকাঙ্খী ও সিলেট বিএনপি, ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নিয়ে বিশাল শোডাউন করে যান নগরীর তোপখানাস্থ অস্থায়ী নগর ভবনে। মেয়রের চেয়ারে বসার তিন ঘন্টার মাথায়ই ফের মেয়রের পদ থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এমন খবর আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন অ্যাক্ট উপ-সচিব মো. মাহমুদুল আলম কর্তৃক সিলেট সিটি করপোরেশনে একটি ফ্যাক্স বার্তা প্রেরণ করা হয়।

ওই বার্তায় বলা হয়েছে আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা-৪/২০০৯ এর সম্পূরক অভিযোগপত্র গত ২২ মার্চ আদালতে গৃহীত হয়েছে।

সেহেতু সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্থানীয় সরকার বিভাগ আইন ২০০৯ এর ১২ উপধারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

ওই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলাটি হচ্ছে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের জীবদ্দশায় দিরাইয়ে একটি জনসভায় বোমা হামলার মামলা।

২০০৪ সালের ২১ জুন দুপুরে সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি জনসভায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।

এদিকে দীর্ঘ ২৩ মাস পর আদালতের রায়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার একঘন্টার মধ্যেই তাকে ফের বরখাস্তের আদেশ জারি করে সরকার।

রবিবার তিনটার দিকে মেয়র বুলবুলকে বরখাস্তের একটি চিঠি ফ্যাক্সে সিটি করপোরেশনে আসে বলে জানান রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন।

তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তার দপ্তরে আসে। পরে চিঠিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের দপ্তরে দেয়া হয়।

চিঠি পাওয়ার পর মেয়র বুলবুল তার দপ্তর থেকে চলে যান বলে জানান শরীফ উদ্দিন।

চিঠিতে উল্লেখ্য করা হয়েছে, রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ২০১৫ সালের ১৭ নম্বর মামলার অভিযোগপত্র গত ৮ ফেব্রুয়ারি আদালত গ্রহণ করেন। যেহেতু আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে সামিয়ক বরখাস্তের বিধান রয়েছে সেহেতু স্থানীয় সরকার আইনের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হইলো।

এর আগে দিনব্যাপী চলে নানা নাটকীয় ঘটনা। রবিবার দুপুর ২টার দিকে মেয়রের দপ্তরের তালা ভেঙ্গে তিনি ভিতরে প্রবেশ করেন। তার আগে সকাল ১০টার দিকে দায়িত্ব নিতে গিয়ে দেখেন মেয়রের দপ্তরে তালা ঝুলছে। কে বা কারা তালা দিয়েছিল তা জানা যায়নি বলে জানান বোয়ালিয়া থানার ওসি শাহাদত হোসেন খান।

ওসি বলেন, সকাল ১০টার দিকে মেয়র বুলবুল নগর ভবনে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন মেয়রের দপ্তর তালাবদ্ধ। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও প্রবেশ করতে না পেরে ওই কক্ষের পাশে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে বসেন তিনি। এসময় সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুপুর ২টার দিকে পুলিশের সহযোগিতায় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. শরীফ উদ্দিন তালা ভেঙ্গে মেয়রকে তার দপ্তরে প্রবেশের সুযোগ করে দেন বলে জানান তিনি।

রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন বলেন, কে বা কারা মেয়রের দপ্তরে তালা দিয়েছিল তা তিনি জানেন না। তবে বিষয়টি বিভাগীয় তদন্ত করা হবে বলে জানান।

এদিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের মেয়রের দায়িত্ব নেয়াকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে নগর ভবনের সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সকাল ১১টার দিকে নগর ভবনে মেয়র বুলবুলের আহবান করা সংবাদ সম্মেলন হয়নি। নগর ভবনে দেখা যায়নি দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম-উল-আযীমকেও।

এভাবেই সারাদিন হট্টগোলের মধ্যেই সময় কেটেছে মেয়র বুলবুলের। তবে দায়িত্বগ্রহণ সংক্রান্ত একটি ফাইলে স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে ৭ মে রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের ১০ মার্চ উচ্চ আদালত তার বরখাস্ত আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মাহমুদুল আলমের সাক্ষরিত চিঠিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভারপ্রাপ্ত মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরই রবিবার দায়িত্ব নিতে নগর ভবনে যান মেয়র বুলবুল।

অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার শেষ কার্যাদিবসে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম-উল-আযিম তিন ঘন্টার ব্যবধানে এক কোটি ৪২ লাখ টাকার চেকে স্বাক্ষর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ২৫টি চেকের পাতার মাধ্যমে ওই টাকাগুলো উত্তোলনের ব্যবস্থা করে যান তিনি। বিভিন্ন ঠিকাদারসহ নামে-বেনামে বিভিন্ন ভুয়া কাজ দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে বিদায় বেলায় ওই টাকাগুলো সিটি করপোরেশনের কোষাগার থেকে উত্তোলনের ব্যবস্থা করে যান নিযাম।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরে ‘চোর চোর চোর বড় চোর নিযাম তুই বড় চোর’ এমন স্লোগানও দিতে থাকেন কর্মচারীরা। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল রবিবার সকাল ১১টার দিকে নগর ভবনে গিয়ে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই নিযামের বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

তবে বিষয়টি নিয়ে নিযামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ঢাকায় আছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা  জানান।

নিযাম পুনরায় দায়িত্ব ফিরে পেতে আপিল বিভাগের দেওয়া রযালে বিরুদ্ধে গতকালই রিভিউ পিটিশন দাখিল করেন বলেও নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। এসময় নিযামের পক্ষ হয়ে রিভিউ পিটিশনের একটি কপিও সাংবাদিকদের কাছে বিলি করা হয়।

 এদিকে নিযামের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরে  বরখাস্ত হওয়ার আগে মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘আজকে সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠানকে (রাসিককে) চোরের আখড়া তৈরী করে ফেলা হয়েছে। গত দুই বছর এই সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেই কাউন্সিলর দায়িত্বে ছিলেন আমি বসেই দেখতে পেয়েছি তার নামে দুর্নীতির অভিযোগ। তাহলে সহজেই বোঝা যায় গত দুই বছরে সিটি করপোরেশনের সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়েছে। সাধারণ জনগণের সেবা প্রাপ্তির জায়গাটি অবমূল্যায়িত হয়েছে। এই অনিয়ম দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত যারা আছেন, আগামী দিনে জনগণের কাছে তাদের কৈফিয়ত দিতে হবে।

  •