দিল্লিতে টানা ৬ ঘন্টা অপারেশন থ্রিয়েটারে সালাহউদ্দিন আহমদ

প্রকাশিত: ২:১১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১১, ২০১৭

দিল্লিতে টানা ৬ ঘন্টা অপারেশন থ্রিয়েটারে সালাহউদ্দিন আহমদ

সফল অস্ত্রোপচার দাবি চিকিৎসকদের

গুম রাজ্যের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাওয়ার তৃতীয় বার্ষিকীর দিনেই টানা ৬ ঘন্টা অপারেশন টেবিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ছুরি-কাঁচির নিচে কাটালেন কক্সবাজারের জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি, দেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম দলটির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত টানা ৬ ঘন্টা কিডনীর অপারেশন শেষে সফল অস্ত্রোপচারের কথা জানিয়েছেন ভারতের রাজধানী দিল্লির নিকটবর্তী হরিয়ানা রাজ্যের বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান মেদান্ত হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকরা টানা এই অস্ত্রোপচার শেষে বাংলাদেশের এই রাজনীতিবিদকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে (আইসিইউ) রেখেছেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমদের কিডনীর অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।

ওই হাসপাতালে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদের নিকটাত্মীয় ছফওয়ানুল করিম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অপারেশন টেবিল থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে সরাসরি আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পর সালাহউদ্দিন আহমদকে কেবিনে স্থানান্তর করা হবে।

মেদান্ত হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে ছফওয়ানুল করিম জানান, সালাহউদ্দিন আহমদের বাম কিডনীতে অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষায় এটি ‘লেফট রোবটিক পাইলোপ্লাস্টি’ অপারেশন। চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি বড় ধরণের অস্ত্রোপচার। এই অস্ত্রোপচারে মেদান্ত হাসপাতালের কিডনী বিভাগের প্রধানসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক অংশ নেন। তবে কিডনী বিভাগের প্রধান চিকিৎসকের নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

২০১৪ সালের ১০ মার্চ রাতে বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্বপালনকালিন ঢাকার উত্তরার একটি ভবন থেকে অজ্ঞাত অস্ত্রধারিদের হাতে ‘অপহৃত’ হয়ে ‘গুম’ হয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আর ঠিক তিনবছর পর ২০১৭ সালের ১০ মার্চ ভারতের রাজধানী দিল্লীর সীমান্তবর্তী হরিয়ানা রাজ্যের বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান মেদান্ত স্পেশালাইজড হাসপাতালে কিডনির অপারেশনে গেলেন শুক্রবার (১০ মার্চ) এই রাজনীতিবিদ।

সালাহউদ্দিন আহমদের ঘনিষ্ট সূত্রমতে, তাঁর কিডনীতে জটিলতা দেখা দেয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কোমরে ও শরীরে ব্যথা নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। পরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ওই দেশে অনুপ্রবেশের অভিযোগে চলমান মামলায় জামিনে থাকা সালাহউদ্দিন আহমদ আদালতের অনুমতি নিয়ে দিল্লীর ওই বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেছেন।

এদিকে এক বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন আহমদের শরীরে সফল অস্ত্রোপচারের মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও নিকটজনরা। একই সাথে তারা সালাহউদ্দিন আহমদের দ্রুত সুস্থতার জন্য কক্সবাজার জেলাবাসির পাশাপাশি পুরো দেশবাসির দোয়া চেয়েছেন।

দিল্লীতে থাকা ছফওয়ানুল করিম ও কক্সবাজারে থাকা নুরুল ইসলাম হেলালী জানিয়েছেন, চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং থেকে কিডনীর চিকিৎসার জন্য দিল্লী সীমান্তের মেদান্ত হাসপাতালে যান। ওখানে এই ক’দিন শারিরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হয়েছে।

তারা জানান, ইতিপূর্বেও একই হাসপাতালে সালাহউদ্দিন আহমদের গলায় অস্ত্রোপচার হয়েছিল। প্রায় বছরখানেক আগে অস্ত্রোপচারের সময়ই তাঁকে কিডনীতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের শেষদিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল, দেশের প্রধানতম বিরোধী দল বিএনপি যখন নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে টানা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখন দলটির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন তৎকালিন যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অজ্ঞাতস্থান থেকে পাঠানো তাঁর বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা গুলো যখন দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছিল ঠিক তখন ২০১৪ সালের ১০ মার্চ রাতে ঢাকার উত্তরা এলাকার একটি ভবন থেকে সরকারী আইন-শৃংখলা বাহিনী পরিচয়ে একদল অস্ত্রধারী সালাহউদ্দিন আহমদকে ‘অপহরণ’ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

সরকারী বাহিনী পরিচয়ে তাকে তুলে নেয়া হলেও আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত কোন বাহিনীই তখন তাঁকে তুলে নেয়ার কথা স্বীকার করেনি। সেই থেকে দীর্ঘ একবছর দুইদিন ‘গুম’ থাকার পর ২০১৫ সালের ১২ মার্চ ভারতের পাহাড়ঘেরা রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে গলফ কোর্স ময়দানে চোখ বাঁধা অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমদকে ছেড়ে দেয়া হয়।

দীর্ঘদিনের ‘গুম’ রাজ্য থেকে ফিরিয়ে দেয়ার পর শিলং গলফ কোর্স ময়দান থেকে একটি সাদা গাড়ী চলে যেতে দেখেছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। এই নিয়ে কখনোই তিনি বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি। মিডিয়াকে তিনি শুধু এইটুকু জানাতে পেরেছিলেন, অস্ত্রধারীরা তাঁকে তুলে নেয়ার পর থেকে একটি বদ্ধঘরে আটকে রাখা হয়েছিল।

এক কাপড়ে এক রুমে এক থালায় খাবার দিয়ে তাঁকে রেখে দেয়া হয়েছিল। অপহরণকারীদের কেউই তাঁর সাথে সেই সময়কালে কোনদিন কথা বলেননি।

সালাহউদ্দিন আহমদ মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে যখন ওই রুম থেকে বের করে চোখ বেঁধে গাড়ীতে তোলা হয়েছিল তখন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি হত্যা করা হয় লাশ যেন গোপন করা না হয়। আমার পরিবারের হাতে তোমরা লাশটি তুলে দিও।’

সেই কথার পরও তাদের কেউ একটি শব্দও সালাহউদ্দিন আহমদের সাথে বলেননি!

শিলংয়ে ছেড়ে দেয়ার পর তিনি যখন উ™£ান্তের  মতো রাস্তার পাশে ঘুরছিলেন তখন ছিল কাক ডাকা ভোর। সেই ভোরে রাস্তায় হাঁটতে বের হওয়া লোকদের জিজ্ঞেস করে সালাহউদ্দিন আহমদ জেনে ছিলেন শহরটি শিলং। পরে তিনি পুলিশ ষ্টেশনে গিয়ে নিজের পরিচয় তুলে ধরলেও দীর্ঘ একবছরের না কামানো দাঁড়ি গোফের কারণে পুলিশ তাঁকে পাগল ভেবে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকেই ডাক্তারের মাধ্যমে তিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। আর সেই সাথে অবসান ঘটে একবছর দুইদিনের ‘গুম’ রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস।

উল্লেখ্য, সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারী চাকুরী থেকে সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর সেই দায়িত্ব পালনের পর তিনি সরকারী চাকুরী ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন। রাজনীতিতে আসার পরও তার উত্থান চলতেই থাকে। তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়ে আসার পর যেমন রাজনীতিতে উত্থান ঘটে, তেমনি চকরিয়া-পেকুয়া সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে টানা ৩ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। একই সাথে তিনি সর্বশেষ বিএনপি সরকারের সময়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি দলটির যুগ্ন-মহাসচিবও হন।

দলে ও দলের নেতৃত্বের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করে তিনি এখন দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সর্বকনিষ্ট সদস্য হিসাবে যুক্ত হয়েছেন।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট