যেভাবে খাদিজা বেগম নার্গিসকে হত্যার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নেতা বদরুল

প্রকাশিত: ১২:৪৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০১৭

যেভাবে খাদিজা বেগম নার্গিসকে হত্যার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নেতা বদরুল

সিলেটে কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস হত্যাচেষ্টা মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পরেই। এর ফলে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নিজের ওপর হামলার বিচার পেতে যাচ্ছেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা খাদিজা।

বেলা সাড়ে ১১টায় সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এর আগে আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ৮ মার্চ রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন তিনি।

গত বছরের ৩ অক্টোবর সিলেট এমসি কলেজে ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের নৃশংস হামলার শিকার হন সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। খাদিজাকে কোপানোর দায়ে ঘটনাস্থল থেকে শাহজালাল বিশ্ববদ্যিালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলমকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে জনতা। বদরুলের চাপাতির আঘাতে খাদিজার মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্কও জখম হয়। খাদিজাকে কোপানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

হামলার পর প্রথমে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ও পরে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় খাদিজাকে। সেখানে ৪ অক্টোবর বিকেলে অস্ত্রোপচার করে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় খাদিজাকে। পরে ১৩ অক্টোবর তার লাইফ সাপোর্ট খোলার পর ‘মাসল চেইন’ কেটে যাওয়া তার ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়।

ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিন দফা অস্ত্রোপচারের পর শরীরের বাঁ পাশ স্বাভাবিক সাড়া না দেয়ায় চিকিৎসার জন্য স্কয়ার থেকে সাভারের সিআরপিতে পাঠানো হয়। সিআরপিতে তিন মাসের চিকিৎসা শেষে ২৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরেন কলেজছাত্রী খাদিজা।

এদিকে, ঘটনার পরদিন খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩০৭, ৩২৪ ও ৩২৬ ধারায় শাহপরান থানায় বদরুলকে একমাত্র আসামী করে মামলা করেন। ওইদিনই বদরুলকে বহিস্কার করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

৫ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বদরুল। ৮ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর শাহপরান থানার এসআই হারুনুর রশীদ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ১৫ নভেম্বর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। ২৯ নভেম্বর আদালত বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন খাদিজা। এরমাধ্যমে মামলার ৩৬ সাক্ষীর ৩৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। বদরুলের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে ও খাদিজা সিলেট সদর উপজেলার আউশা গ্রামের মাসুক মিয়ার মেয়ে।

যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা করে বদরুল

থানায় পুলিশের কাছে বদরুল স্বীকার করেছেন, প্রেম প্রত্যাখ্যান করায় খাদিজাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই আক্রমণ চালান তিনি। ২৬০ টাকা দিয়ে ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় চাপাতি কিনে বদরুল।

বদরুল আদালতকে জানান, খাদিজার সাথে তার দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের বাড়িতে লজিং থাকাকালে তার সাথে এ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানজানি হওয়ার পর খাদিজার পরিবার তা মেনে নিতে পারেনি। তাকে (বাদরুল) তাদের (খাদিজা) বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে পারিবারিক চাপে খাদিজা সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। বারবার তাকে সম্পর্ক রাখার জন্য চাপ দিলেও সে পাত্তা দেয়নি। গত সোমবার পরীক্ষার খবর পেয়ে খাদিজার সাথে দেখা করতে এমসি কলেজে যান বদরুল। সেখানে গিয়ে খাদিজার সাথে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু খাদিজা পাত্তা না দিয়ে উল্টো রূঢ় আচরণ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাথে থাকা চাপাতি দিয়ে খাদিজাকে কোপাতে থাকেন বদরুল।

মেয়ের ওপর হামলার খবরে দেশে ফেরেন মাসুক মিয়া

এদিকে মেয়ের ওপর বর্বর হামলার খবর পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন প্রবাসে থাকা মাসুক মিয়া। নার্গিসের ওপর বর্বর হামলার খবর পেয়ে ৫ই অক্টোবর বিকেলে কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে জেদ্দা থেকে ঢাকায় ফিরেন তিনি। দেশে ফেরার আগে মক্কায় গিয়ে মেয়ের জন্য দোয়া করেছেন।

মাসুক মিয়া বলেন, সিলেট পুণ্যভূমি। এখানকার মানুষ অনেক সভ্য, ভদ্র। এখানে বদরুলের মতো একটা কুলাঙ্গার জন্ম নিতে পারে তা মানুষ ভাবতেও পারে না। কিন্তু যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানে আরো অনেক মানুষ ছিল। তারা তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিলে আমার মেয়ের হয়তো এই অবস্থা হতো না। তারা ভিডিও না করে মেয়েকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারতেন।

তবে যারা নার্গিসকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মাসুক মিয়া বলেন, ইমরান নামের এক সাধারণ ছাত্র আমার মেয়েকে উদ্ধার করে মেডিকেলে নিয়ে গেছে। নার্গিসের রক্তে তার শার্ট-প্যান্ট লাল হয়ে গেছে। আল্লাহর কৃপায় ও ওসমানী মেডিকেল এবং স্কয়ারের ডাক্তারদের চিকিৎসার কারণেই মেয়েটি এখন সুস্থ হয়ে উঠছে। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।

বদরুল সম্পর্কে নার্গিসের পিতা বলেন, বদরুল কে তা জানতাম না। শুনেছি বেশ আগে সে দুই মাস আমার বাড়িতে লজিং ছিল। পরে আমরা সন্তানরা তার আচরণ টের পেয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। ওই ছেলে এরকম কাণ্ড করবে তা কেউ কল্পনা করেনি। আমি দেশের বাইরে থাকি। যে কারণে সন্তানদের নিয়ে চিন্তায় থাকি। আমার মেয়ে লেখাপড়া করতো। তার আসা-যাওয়ার জন্য একটা সিএনজি অটোরিকশা আছে। আমার ভাই তাকে কলেজে নিয়ে যেত, নিয়ে আসতো। তারপরও এই ঘটনা ঘটে গেল।

মাসুক মিয়া বলেন, শুধু আমার মেয়েকে কুপিয়েছে এজন্য না। এরকম ঘটনা যেন আর না ঘটে। এভাবে যেন আর কোনো নার্গিসকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যেতে না হয়। তাই বদরুলের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আদালতে মুখোমুখি খাদিজা-বদরুল

২৬ ফেব্রুয়ারি সিলেট আদালতে হাজির করা হয় আসামি ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমকে। এদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আদালতে আসেন খাদিজা বেগম নার্গিস। বিচারকের সামনে বদরুলকে সনাক্ত করে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন খাদিজা।

এদিন আদালতে বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।

জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা খাদিজাকে জেরা করেন। আসামীকে চেনেন কি না আসামীপক্ষের আইনজীবীর এক প্রশ্নের জবাবে খাদিজা বলেন, সে আমার ছোটভাইবোনদের পড়াতো সে সুবাদে তাকে আমি চিনতাম।

খাদিজার ব্যবহৃত মোবাইলটি আসামী বদরুল কিনে দিয়েছিলো কি না এমন প্রশ্নের জবাবে খাদিজা বিষয়টি অস্বীকার করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ঘটনার দিন আসামী বদরুলের দেয়া খাবার ও পানীয় গ্রহণ করার বিষয়টিও অস্বীকার করেন খাদিজা।

পরিক্ষা কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ হাত দূরত্বের ঘটনাস্থলে খাদিজা স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি সেখানে স্বেচ্ছায় যাননি বলে আদালতকে জানান।

এসময় উত্তেজিত বদরুল বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, ‘আমি কিছু বলতে চাই। আমাকে একটা সুযোগ দিন। আমি সত্য কথা বলবো। আমি একজন শিক্ষক ছিলাম, আমি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক।’

এসময় বদরুলকে সতর্ক করে দেন আদালতের বিচারক সাইফুজ্জামান হিরো। বিচারক বলেন, ‘আদালত বক্তৃতা দেয়ার জায়গা নয়।’ বিচারকের কাছ থেকে অনুমতি না পেয়ে কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন বদরুল।

ওই সময় ফের উত্তেজিত বদরুল চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘তুমি সুখী হও, খাদিজা। বিচারক আল্লাহ আছেন। আমার ফাঁসি হোক। তুমি আমার পরিবারকে পথে বসিয়েছ। মিথ্যাবাদী।’

এসময় বদরুলের আইনজীবি ও উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে নিবৃত্ত করে এজলাস থেকে বের করে নিয়ে যান।

এদিকে নারী দিবসে দেয়া রায়ে ন্যায়বিচার পাবেন খাদিজা আর নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই রায়- এমনটাই আশা করছেন খাদিজার স্বজনসহ সচেতন মহল।

খাদিজা বেগম নার্গিসও এ মামলার রায়ে- নিজের ওপর হামলাকারী বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। মঙ্গলবার বিকেলে নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে খাদিজা বলেন, আমার ওপর এমন সহিংস হামলায় বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে যেমন সমাজে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, তেমনি আমার জীবন আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে অন্যায়কারীরা আরো সাহস পাবে এমন আরো ঘটনা ঘটাতে। নারীরা আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। তাই আমি আশা করছি- বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট