নারীর প্রকৃতি, প্রকৃতির নারী

প্রকাশিত: ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০১৭

নারীর প্রকৃতি, প্রকৃতির নারী

৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই একটা দিবসের মধ্যে নারীর অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। আর অধিকার, ক্ষমতা এগুলো কেউ কাউকে এমনি এমনি দেয় না। আদায় করে নিতে হয়।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী, দেশের দ্বিতীয় প্রভাবশালী নেত্রীও নারী, বিরোধী দলের নেত্রী নারী। উনাদের এই অবস্থান কোন অধিকার আন্দোলনের ফসল নয়। বরং উনাদের যোগ্যতার ফসল। নারীর অধিকারটুকু পুরোপুরি অর্জন করতে হলে নারীকে অবশ্যই দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা ও মননের পরিচয় দিতে হবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে নারী তার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অংশ নিতে পারে।

নারীর জীবন এক ধরনের অভিঘাত অভিযাত্রা, যেখানে সাহসের প্রয়োজন হয়। যাতে কখনো এক ঘেয়েমী আসে না। যখনি একটা মেয়ে নারী হয়ে জন্ম নেয় এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে চায় তখন অবশ্যই তাকে অনেক কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। শুরুতেই নারীকে সংগ্রাম করতে হবে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব থেকে নারী বিচ্ছিন্ন কেউনা। নারীকে এটাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে তার সুন্দর মসৃন শরীরের অধিকার একমাত্র তার নিজের।

সেখানে সে ছাড়া আর কোন ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের কোন ক্ষমতার অধিকার নেই; আছে বুদ্ধিবৃত্তির স্থান, আছে যা আত্নপ্রকাশের জন্য আঁকা বুকি করছে। নারীকে বুঝাতে হবে মা হওয়া তার আরো ২-৪ টা অধিকারের মতই একটা অধিকার। তাকে জানতে হবে এসব সত্য কথা সে চার পাশের খুব কম জনকেই বুঝাতে বিশ্বাস করাতে পারবে । তারপরেও নারীকে হতাশ হলে চলবে না। মনে রাখতে হবে বিজয়ের চেয়ে বিজয়ের সংগ্রাম মহত্তর; গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে শুভযাত্রা অনেক সুন্দর ।

নারীকে বুক ফুলিয়ে গর্ববোধের অনুভূতি থাকতে হবে সে নারী। তার আছে অসাধারন কিছু । মাতৃত্বকে ধারন করার এক অপূর্ব ক্ষমতা তার হাতে। মাতৃত্ব কোন সীমাবদ্ধতা নয় এ যে যোগ্যতা । নারীদের মধ্যকার পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই মুক্তির একমাত্র পথ। যা নারীই নারীকে দিতে পারে। আর এসব কিছুই এক নিষ্ক্রিয় নারী আর সক্রিয় নারীর পার্থক্য নিরূপন করে। শোষিত কোন জাতি যেমন অন্য একটি জাতিকে অধিকার দিতে পারেনা, তেমনি দিতে পারেনা জীবনের নিরাপত্তা। তাই নারীর অধিকার আন্দোলনের কাজ সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়ে নারীকেই করতে হবে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে অস্বীকার করবার কোন জো নেই। সামাজিক ও পারিবারিকভাবেই আমাদের নারীদের মূল্যবোধ ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করে ব্যক্তির নিজস্বতাকে, অভিনবত্বকে ব্যক্তি হিসেবেই মূল্য দেয়। যেমনটি বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক শেক্সপীয়রের নারী চরিত্রগুলোতে বিদ্যমান। নারী যেখানে প্রধান চরিত্র না হলেও কেন্দ্রীয় চরিত্রেই অবস্থান করে। বা দু’এক ক্ষেত্রে কাছাকাছি বা সামনে সমান। সব স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যের মাঝখানে সত্য একটাই তা হচ্ছে নারী পূর্ণতা চায়।

নারী কেবলমাত্র বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্যই সম্পদের সম্ভাবনাময় উৎস নয়; গোটা বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী যেখানে নারী, সেখানে নারীকে পেছনে ফেলে রেখে কোন দেশ বা জাতির পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই নারী পুরুষকে একই পাটাতনে রেখেই কর্ম নির্ধারণ করতে হবে। ১৯৮২তে প্রকাশিত ‘Village Women of Bangladesh’ গবেষনাপত্রের সূচনা বক্তব্যে বলা হয়েছে, এখানে নারীরা নিজেরাই সম্পদ নয় বরং তারা সম্পদকে সুষঠুভাবে ব্যবস্থাপনার উপায় হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ এবং অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার প্রাপ্তি নির্ভর করছে তাদের গ্রামীন নারীদের অধিক মাত্রায় ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর।

খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জন্মনিয়ন্ত্রনে সফলতা নির্ভর করে নারীর ওপর যথাক্রমে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন ও জন্মশাসনের মাধ্যমে। প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি গৃহের প্রতিটি নারীই অদৃশ্যমানভাবে পরিবেশগত চক্রকে বজায় রেখে মানবজীবনকে টিকিয়ে রাখছে তার খাদ্য, পুষ্টি, পানি ও মৌলিক চাহিদা পূরনের মধ্য দিয়ে। জীবনের টিকে থাকার প্রসঙ্গে সর্বশেষ পর্যবেক্ষনে বলা যায়, পরিবেশগত চক্রের অখন্ডতা রক্ষায় কাজ করে যেখানে নারীর উৎপাদনশীলতা ভালোভাবে বিকশিত ও স্বীকৃত।
সমাজ যখনই প্রান্তিক নারীকে অবহেলা করলো, নারীকে উপনিবেশিত করলো; চাহিদা হলো অপূরনীয় এবং প্রকৃতি হলো বিপর্যস্ত। সহিংসতা ও ভাঙ্গনের এই নাটক বেশী দিন চলতে পারেনা। তাই নারীসুলভ রীতির পুনরূদ্ধার হয়ে উঠেছে অত্যাবশকীয়। পরিবেশগত সংকট নিরসনে নারীরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতে পারে কারন তাদের দু’ধরনের জ্ঞান রয়েছে, এক্ষেত্রে যেখানে বর্তমান সুবিধাবাদী মানুষদের প্রবেশাধিকার নেই। প্রথমত প্রগতির শিকার হিসেবে নারীদের অভিজ্ঞতা রয়েছে এক্ষেত্রে, তাই প্রগতির বোঝা ও মূল্য তাঁরাই বুঝবে সবচেয়ে ভালো। দ্বিতীয়ত নারীদের উৎপাদন ও জীবন সম্পর্কে একটি পরিবেশগত পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রয়েছে।

নারী ও প্রকৃতির এই যোগাযোগ কোনভাবেই বৈপ্লবিক অবস্থানের নির্ধারণ করেনা বরং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে জীবন সংরক্ষনের ভূমিকা রাখে। তাই নারীকে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে নয়; সমাজ, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে স্বীয় কর্মে ফিরিয়ে আনা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক >>>> ফাহমিদা হক
ব্যাবসায়ি ও রন্ধন বিশারদ

পাদটিকা >>>>>>>>>>>>> লেখকের এই লেখা একান্তই তার নিজস্ব, এই লেখার সঙ্গে প্রথম সময়ের কোনও সম্পর্ক নেই !

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট