রাজনীতির অন্ধরমহলে নানা মেরুকরণ, নতুন জোট-মোর্চা গড়ার পরিকল্পনা

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৭

রাজনীতির অন্ধরমহলে নানা মেরুকরণ, নতুন জোট-মোর্চা গড়ার পরিকল্পনা

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় জোটেই নির্বাচনী পালে হাওয়া লেগেছে। উভয়পক্ষ নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকেও দেয়া হয়েছে নির্দেশনা। নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে জিততে দুই বছর আগে থেকেই রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা মেরুকরণ।

এরই মধ্যে জাতীয় পার্টি নতুন জোট গঠন করে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অন্যদিকে বিএনপিও নির্বাচনকে ঘিরে নতুন একটি জাতীয় মোর্চা গঠনের চিন্তা করছে বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। তবে ক্ষমতাসীনরা এই মহাজোটকেই টিকিয়ে রেখে আরো শক্তিশালী করতে চায়। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে আরো কিছু বাম সংগঠনকে নিজেদের জোটে নিতেও প্রস্তুত।

এরই অংশ হিসেবে রাজনীতিতে চলতে নানা হিসেব-নিকেশ। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে একপক্ষ অপরপক্ষকে ঘায়েল করে জনমত নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে চলছে ক্ষমতা ও শক্তির লড়াইয়েও বিরোধীদের ঘায়েলে চেষ্টা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীনরা আবারো ক্ষমতায় ফিরতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। আর এ জন্য যা যা করার দরকার সবই করবে। অন্যদিকে বিরোধীরাও ক্ষমতায় ফিরতে নানা কৌশল করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার আবারো এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে দেখতে চাচ্ছে। এ জন্যই সরকারের গ্রিন সিগনালে এরই মধ্যে এরশাদ তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে নতুন জোট গঠন করে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা বলছে এরশাদ।

অন্যদিকে বিএনপির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, যে কোনো মূল্যে আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতার পটপরিবর্তন চায়। এজন্য তারা বড় ছাড় দিয়েও নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন আনতে রাজি। এজন্য দলের ভেতর ও বাইরে থেকে সর্বদলীয় একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ এবং নির্বাচন পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনের একটি রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে। যেকোনো সময় এটা প্রকাশ্যে আসতে পারে। তবে নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়েও এটা করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

এছাড়াও রাজনীতিতে বিরোধীদের চাপের মুখে রাখতে সরকার নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে রাখা হবে কীনা এ নিয়ে সরকারি দল ও মহাজোটের নেতাদের মধ্যেই চরম মতপার্থক্য চলছে। এ নিয়ে তারা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি ক্ষমতাসীন দলের একটা অংশ চাচ্ছে খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখেই নির্বাচন করতে।

অন্যদিকে অপর একটি অংশের নেতারা চান- খালেদাকে নিয়েই নির্বাচন করতে। তাদের বক্তব্য আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে খালেদা জিয়ার কিছু হলে তা মূলত নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করবে। তাই বিতর্ক এড়াতে সবাইকে নিয়েই নির্বাচন করা ভাল।

তবে সরকার দলীয় একটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা চাচ্ছেন খালেদাকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করতে। কিন্তু দলের তৃতীয় সারির তরুণ নেতা এবং শরীক দলের কিছু কিছু নেতারা খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোর বিরোধী। তারা চাচ্ছেন যে কোনো মূল্যে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে।এক্ষেত্রে কয়েকজন মন্ত্রীও রয়েছেন। তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে চাপ অব্যাহত রেখেছেন। তবে দুপক্ষই তাদের অবস্থানে অনড়। তাদের বক্তব্য তুলে ধরলেও এ বিষয়ে জোটের শীর্ষ নেত্রীর কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি। সবমিলেই রাজনীতির অন্ধর মহলে চলছে নানা মেরুকরণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে এ ধরনের খেলা বরাবরই হয়ে আসছে। রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষে মনোবল ভেঙ্গে দিতে ক্ষমতাসীনরা বরাবর নানা কৌশল অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়াকে নিয়ে সম্প্রতি যে ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে, এটাও ক্ষমতাসীনদের একটা কৌশল। এর মাধ্যমে বিএনপি তথা বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে ফায়দা নিতে চাচ্ছে সরকার।

অধ্যাপক এমাজ উদ্দীন আহমেদের মতে এ ধরনের চাপ সামলে উঠতে পারলে বিএনপির পক্ষে জনসমর্থন আরো বাড়বে। আর যদি এটা সামলে না উঠতে পারে তবে দল ভাঙ্গারও চেষ্টা করবে ক্ষমতাসীনরা। এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়ার মাধ্যমে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে ফায়দা নিতে চাচ্ছে সরকার।

সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অচিরেই জেলে যাচ্ছেন এমন গুঞ্জন এখন সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে। এমন কী বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মুখেও উচ্চারিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই মামলায় (জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে এমন বদ্ধমূল ধারণা এখন দলের শীর্ষ স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে বেগম জিয়া জেলে গেলে তখন বিএনপি কীভাবে এবং কার নেতৃত্বে চলবে এ নিয়েও শুরু হয়েছে নানা অপ্রকাশ্য গুঞ্জন।

এইতো পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবারই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বেগম জিয়ার কারাগারে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। আর বেগম জিয়া কারাগারে গেলে এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না।

তবে রাজনীতির মাঠে নেতারা যাই বলুক না কেন, খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিএনপির শীর্ষ নেতারা। কেননা, সরকারের মোটিভ আগেই আঁচ করতে পারছেন তারা।

দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে না দিয়ে এমন অঘটন ঘটলে দল কীভাবে চলবে এরই মধ্যে নেতারা সে ধরনের আগাম প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছেন। সেই সময়ে ৫ সদস্যের একটা কমিটি করা হতে পারে যাদের সমন্বিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দলে যাতে বিভক্তি না ঘটে সেজন্য ওই সময় দলের প্রতিনিধিত্ব করবে জিয়া পরিবারেরই কেউ না কেউ।

এ বিষয়ে পরামর্শ করতে সম্প্রতি বিএনপি সমর্থক এক বুদ্ধিজীবীর বাসায় দলের কয়েকজন নেতা ও থিঙ্কট্যাংকের কয়েক সদস্য বৈঠকও করেছেন। সেখানে ৫ সদস্যের একটি ‘আপদকালীন’ কমিটি করার কথা জানা গেছে।

ওই সূত্রে আরো জানায়, স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, একজন উপদেষ্টা কিংবা প্রভাবশালী একজন যুগ্ম মহাসচিবের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের ‘আপদকালীন’ ওই কমিটি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। যারা ওই সময় আন্দোলন হলে দলকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।

দলের একটি সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে যেতে হবে এমন প্রতিকূল বিষয় মাথায় রেখে এখন পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন বেগম জিয়া। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্যপদ পূরণ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, জেলা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। এর মধ্যে স্থায়ী কমিটির তিন শূন্যপদসহ ছাত্রবিষয়ক ও সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক, দুজনকে আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং দুজন বিশেষ সম্পাদক পদে নিয়োগের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত।

শোনা যাচ্ছে মধ্য সারির নেতাদের সঙ্গে চেয়ারপারসন আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছেন বেশি। তার কারণ হিসাবে জানা গেছে দলের বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নেতার ওপর তিনি এখন আর আস্থা রাখতে পারছেন না। অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির তরুণ ও মধ্য সারির নেতাদের বেগম জিয়া বলছেন, তোমাদের ওপর আস্থা আছে, আমি কারাগারে গেলে তোমাদেরকেই দলের জন্য কাজ করতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক নেতা বলেন, ম্যাডামের ধারণা দলকে বিভক্ত করতে কয়েকজন নেতা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করছেন। এদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির দুজন নেতাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তিনি। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।

সাজা হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন রাজনীতিতে আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারবেন কিনা তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন তার আইনজীবীরা। কারণ রায়ে এমন কিছুও থাকতে পারে, যাতে তিনি রাজনীতিতে আর প্রত্যক্ষভাবে থাকতে পারবেন না।

এ বিষয়ে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, দূরদর্শিতা থাকলে সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীকে কারাগারে পাঠাবে না। আর যদি তাকে কারাগারে পাঠানো হয়ই, তার অনুপস্থিতিতে কীভাবে দল চলবে সেই পরিকল্পনা গ্রহণের মতো দূরদর্শিতাও বেগম জিয়ার আছে।

তিনি বলেন, সরকার কিংবা দলের ভেতরে কোনো নেতা যদি ভাবেন, বেগম জিয়া জেলে গেলে দলের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে কিংবা দলে বিভক্তি হতে পারে, তাদের বলব- ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময় থেকে শিক্ষা নিন। তখন শত চেষ্টা করেও বিএনপিকে বিভক্ত করা যায়নি। সবাই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, এখনো আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।

তবে এ বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন বেগম জিয়ার কারাগারে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। আর বেগম জিয়া কারাগারে গেলে এ দেশে নির্বাচন হবে না।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে মিথ্যা বা সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচন দেয়া হলে তা কখনো সফল হতে দেয়া হবে না এবং দেশের মানুষ এমন প্রহসনের নির্বাচনে কোনো দিন অংশ নেবে না।

তিনি আরো বলেন, সরকারের এই নিল নকশা কখনো বাস্তবায়ন হবে না। দেশের মানুষ তা কোনোভাবেই মেনে নিবে না।

তবে শনিবার সকালে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলেও তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। দেশে আর কোনো দিন এক দলীয় নির্বাচন হবে না। বিএনপির আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি একসঙ্গে চলবে।

মওদুদ আহমেদের এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কী ক্ষমতাসীন, কী বিরোধী সব মহলেই এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

এমন কী নিজ দলের নেতাকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। দলটির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা তার  এমন বক্তব্যে বাজে ভাষায় মন্তব্যও করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকেও মওদুদের কড়া সমালোচনা করে চলছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির শীষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, বিষয়টি নিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন। কেননা, এমন মন্তব্য দলকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।

  •