সকল ক্ষেত্রে বিপর্যয় নামবে

প্রকাশিত: ১:১৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৭

সকল ক্ষেত্রে বিপর্যয় নামবে
বর্তমান সরকারের শাসনামলে দফায় দফায় জ্বালানি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের মূল্যও বাড়বে, আর এ কারণে বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য। এই নিয়ে এই সরকারের আমলে গ্যাসের দাম ৫ গুণ বৃদ্ধি পেলো। এতে দেশের পরিবহন খাতসহ খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে। বিপর্যয়ে পড়বে রফতানি খাতও। : বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিশিষ্টজন গ্যাস ও বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই মূল্যবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গত বৃহস্পতিবার বলেন, সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে জনগণকে জিম্মি করে এই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। এদিকে এফবিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ মিডিয়ায় বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে রফতানিমুখী শিল্পখাত চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, এলএনজি ও এলপিজি এলে জ্বালানির দাম বাড়নো হবে। রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে রফতানিমুখী শিল্প আরো ঝুঁকিতে পড়বে। বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের দাম কমছে, এ ব্যবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়লে অনেক পোশাক শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এক বিবৃতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক মন্তব্য করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেছেন, অনির্বাচিত অবৈধ সরকারের সময়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি অযৌক্তিক। : অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি বেশ এগিয়ে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিও বেশ নিয়ন্ত্রণে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসা পরিচালন ব্যয়, উৎপাদ ব্যয় বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে পণ্যের মূল্য। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। এ দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়বে পণ্যের দাম। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ। কারণ আমরা সবসময় দেখি গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুট করে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হয়। বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে রফতানিতে একটি বিরূপ প্রভাব রয়েছে। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে রফতানি আয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। যদি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে দর কসাকসি করে মূল্য বাড়াতে না পারে তাহলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো অবশ্যই জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। যারা সীমিত আয়ের লোক তাদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে। কারণ ১০০ টাকা বৃদ্ধি কিন্তু কম নয়। এক্ষেত্রে সরকার বিকল্প কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতো। বিশেষ করে গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। কিন্তু গ্যাস ব্যবহারে তেমন কোনো গাইডলাইন নেই। আমরা শুধু ব্যবহারই করে যাচ্ছি। গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি জনগণকে ভোগাবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে ১০০ বা ১৫০ টাকা খুব যে একটা বেশি তাও না। দ্বিতীয় ধাপে বাড়বে ৩০০ টাকা। এটা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেন তিনি। : গ্যাসের এই দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, আমরা গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে নই। সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোয় যেসব শিল্প রফতানি করে তারা সমস্যায় পড়বে। তাদের খরচ বেড়ে যাবে। তাই এ ধরনের শিল্পের ক্ষেত্রে বাড়তি দাম না নেয়াই উচিত। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে রফতানিমুখী শিল্পের পাশাপাশি যেসব অভ্যন্তরীণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস ব্যবহার করে তাদের খরচ বেড়ে যাবে। এর ফলে জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যাবে। যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ। তাই গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষকেই বেশি ভুগতে হবে। তবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ বাংলাদেশে গ্যাসের দাম বিদেশের থেকে এখনও অনেক কম। সুতরাং গ্যসের দাম বাড়ার কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে নাÑবলেন মাতলুব আহমদি। : মেনন : গ্যাসের দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘তামাশা’ বলে মন্তব্য করেছে সরকারের দুই শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে ওই দুই দল। গতকাল শুক্রবার পৃথক বিবৃতিতে দুই রাজনৈতিক দলের নেতারা এ দাবি জানান। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় আগামী মার্চ ও আগামী জুন মাসে দুই দফায় বাড়বে গ্যাসের দাম। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাড়বে গ্যাসের দাম। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এক বিবৃতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণাকে অযৌক্তিক মন্তব্য করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ভোক্তারা। এর ফলে জনজীবনে সংকট বাড়বে। এ ছাড়া বিবৃতিতে রাশেদ খান মেনন ও ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘আবাসিক ব্যবহারকারীরা চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাস ঘাটতিরও কোনো সুরাহা হয়নি। এ অবস্থায় এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা গ্রাহকদের সঙ্গে তামাশা ব্যতীত অন্য কিছু নয়।’ বিবৃতিতে নেতারা প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালনায় ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস রোধ করে গ্যাসের মূল্য জনগণের সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এদিকে জাসদের কার্যকরী সভাপতি রবিউল আলম ও সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য শিরীন আখতার এক বিবৃতিতে গ্যাসের অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত জনজীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাঁরা গ্যাসের এ অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। : আনু মুহাম্মদ : গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আজ শনিবার দেশব্যাপী গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করার ডাক দিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। রাজপথ, সড়ক, মহাসড়কে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। এ জন্য দেশবাসীকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির নেতারা। নেতাকর্মীরা জানান, শনিবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি পালিত হবে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকায়  শহীদ মতিউল কাদের চত্বরে (প্রেসক্লাব) অবস্থান নেয়া হবে। জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুন্দরবন-বিনাশী যে প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে তাতে মৎস্যজীবী, বনজীবীসহ এ অঞ্চলের ৩৫ লাখ মানুষ তাদের জীবিকা হারাবে। অরক্ষিত হবে বাংলাদেশ। তাই আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছি। একই সঙ্গে আমরা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। জাতীয় কমিটির সাত দফার ভেতরই আছে জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। কিন্তু সরকার জনগণকে জিম্মি রেখে বৃহৎ সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাড়াতে এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’ এই কর্মসূচি দেশ ও মানুষের কল্যাণে ডাকা হয়েছে দাবি করে আনু মুহাম্মদ সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান। : শফিউল আলম প্রধান : ২০ দলীয় জোট নেতা, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেছেন, অনির্বাচিত অবৈধ সরকার সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে এটা গণবিরোধী। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ভোটের মত জনগণের পেটে লাথি মারার চেষ্টা করবেন না। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন। অন্যথায় জনগণ ক্ষমতার লাইন কেটে দেবে। ভাষা সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি শুধু ভাষা শহীদদের মাস নয় নির্মম সেনা হত্যারও মাস। ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারসহ পিলখানায় নির্মম সেনা হত্যাকে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধেও এত অফিসার প্রাণ হারায় নাই। স্বাধীনতা অর্জন ও রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস)-এর নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে ফেলা হয়েছে। পেয়ারে হিন্দুস্থানের দায় শোধ করতে যেয়ে যাদের চক্রান্তে এই সেনা হত্যা চালানো হয়েছে, ইতিহাসে তাদের ক্ষমা নাই। প্রতি ফোঁটা রক্তের জবাব ইনশা আল্লাহ দেশবাসী নিবে। : এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাগপার সহ-সভাপতি অধ্যাপিকা রেহেনা প্রধান, সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার লুৎফর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, দফতর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা কামাল, যুব সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মোড়ল, যুব জাগপার সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদউদ্দিন, সহ-সভাপতি মাহিদুর রহমান বাবলা, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহীম জুয়েল, যুবনেতা সিরাজুল ইসলাম, ইসহাক মীর, হামিম, জাগপা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নাহিদ হাসান, যুগ্ম সম্পাদক শ্যামল চন্দ্র সরকার, মিনহাজ প্রধান রাব্বি, প্রচার সম্পাদক আবু নাঈম, ছাত্রনেতা আল আমিন প্রমুখ। : হুমকিতে রফতানিমুখী শিল্প : গণপরিবহন ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব : গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে রফতানিমুখী ছোট ছোট শিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক শিল্প-কারখানা। কারণ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে; যা প্রতিযোগী দেশের তুলনায় রফতানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা হ্রাস করবে। রফতানির ওপর নেতিবাচক এই প্রভাবের কারণে বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে সরকার ঘোষিত ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হবে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ী নেতারা মিডিয়াকে এসব কথা বলেছেন। এদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও পরিবহন সেক্টরের নেতারা জানিয়েছেন, গ্যাসের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে গণপরিবহনে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভাড়া বেড়ে যাবে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। যার মাসুল গুনতে হবে সাধারণ নাগরিকদের। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ও ব্রেক্সিটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যাপারেল খাতে মন্দা চলছে। ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ছোট হয়ে আসছে। ৪৮৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার কমে ৪৪৫ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অন্যান্য দেশ যেখানে রফতানি খাতকে চাঙ্গা করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে, সেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধি তো আছেই। সামগ্রিকভাবে চাপে রয়েছে দেশের রফতানিমুখী শিল্প। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান টিকতে না পেরে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। : এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোয় রফতানিমুখী শিল্প খাত চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। প্রতিযোগী সক্ষমতা হারাবে রফতানি খাত। যতদিন না শিল্পে সঠিক মূল্যে কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, ততদিন গ্যাসের দাম স্বাভাবিক রাখা উচিত ছিল। এখন যেহেতু দাম বাড়ানোই হল তাই রফতানিকারকদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় অথবা ইনসেনটিভ দিতে হবে; যাতে তারা আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। : তিনি বলেন, এলএনজি ও এলপিজি এলে এমনিতেই জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে। এই অল্প সময়ের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও সঞ্চালন লাইনের অভাবে ৮ হাজার মেগাওয়াট ব্যবহৃত হচ্ছে। অচিরেই বেসরকারি খাতকে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণে যুক্ত করা উচিত। : বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অ্যাপারেলে চাহিদা কমছে। তার ওপর ক্রেতারা পোশাকের দাম কমিয়েছে, আরও কমাতে চাপ দিচ্ছে। অপরদিকে বিভিন্ন কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোয় প্রতিযোগী সক্ষমতা কমবে। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। : রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বর্তমানে রফতানি খাতে মূল চ্যালেঞ্জ হল- সক্ষমতা কমেছে। অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ব্রেক্সিট, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দামের সমন্বয় ও নিজ নিজ দেশ নীতি সহায়তা দেয়ায় প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা বেড়েছে। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোয় রফতানিমুখী শিল্প আরও ঝুঁকির মুখে পড়ল। তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ছোট হয়েছে। ৪৮৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার কমে ৪৪৫ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্য দেশগুলো মার্কেট শেয়ার ধরে রাখতে নানা নীতি সহায়তা ও ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করছে। আমাদের দেশে হচ্ছে এর উল্টো। : বিকেএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি আসলাম সানি বলেন, বর্তমানে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যায় না। দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা প্রেসার থাকে না। এক কথায় বলতে গেলে, উদ্যোক্তারা এ সময় গ্যাসের বদলে বাতাস পাচ্ছেন, অথচ বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ও ব্রেক্সিটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম ১৯ শতাংশ কমেছে, ইউরোর দাম কমেছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় ইউরোপের ক্রেতারা তৈরি পোশাকের দাম ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমাতে চাপ দিচ্ছে। নতুবা অন্য বাজার থেকে পণ্য কেনার হুমকি দিচ্ছে। সব মিলিয়ে উভয় সংকটে রয়েছে রফতানিকারকরা। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোয় রফতানিমুখী শিল্পের অস্তিস্ত হুমকিতে পড়েছে। : বিটিএমএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, দেশের শিল্প এগিয়েছে দুই কারণে। প্রথমত, সস্তা শ্রম ও দ্বিতীয়ত, নিজস্ব গ্যাস। এ দুটি ছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ নেই। শিল্পের কাঁচামাল ও মেশিনারিসহ সবই আমদানি করতে হয়। গত কয়েক বছরে মজুরি ৩ দফা বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রথম ধাক্কা খায় উদ্যোক্তারা। এরপর গত বছর গ্যাসের দাম ১০০ ভাগ বাড়ানো হয়। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছল। : গণপরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে : গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে গণপরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। সিএনজি স্টেশনের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেছেন, দেশে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য মুনাফাসহ ব্যবসা করছে। সেখানে সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি করে গণপরিবহনে নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ তৈরির কোনো যৌক্তিকতা নেই। সিএনজির দাম বৃদ্ধির কারণে গণপরিবহনের ভাড়া এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করবে। তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধির ফলে সিএনজির ব্যবহার কমবে এবং সেই সঙ্গে ডিজেল ব্যবহার বাড়বে। এতে বায়ুদূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছবে। সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। : ক্যাবের প্রতিক্রিয়া : কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। এখানে ভোক্তাস্বার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি। কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে তা বিইআরসির প্রকাশ করা উচিত। তিনি বলেন, মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ দুটো সংরক্ষণ করতে হয়। এ জন্য আইনের আওতায় রেগুলেশন আছে। তার ভিত্তিতে বিইআরসির কর্মকর্তারা দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু নতুন কমিশন ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্যাবও যেতে পারে। তবে তার আগে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করা হবে। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বাড়তি দাম দুই ধাপে কার্যকর করা হবে। প্রথম ধাপ ১ মার্চ থেকে আর দ্বিতীয় ধাপ ১ জুন থেকে কার্যকর হবে।
  •