‘বাংলাদেশে দমনমূলক আইনে মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধের চেষ্টা অব্যাহত’

প্রকাশিত: ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৭

‘বাংলাদেশে দমনমূলক আইনে মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধের চেষ্টা অব্যাহত’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বাংলাদেশে দমনমূলক আইনে মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের ১৫৯ দেশের ২০১৬-১৭ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক এ সংগঠন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধে দমনমূলক আইনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশে সরকার। ইসলামের নামে দেশটির জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর হাতে বিদেশি নাগরিক, সেক্যুলার অ্যাক্টিভিস্ট, নারী ও পুরুষ সমকামী, হিজড়া ও উভকামীরা হামলা ও হত্যার শিকার হয়েছেন।

এছাড়া গণ-গ্রেফতার, গুম, বেআইনী হত্যাকান্ড, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে মানবাধিকার লংঘন হয়েছে দেশটিতে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকার দমনমূলক আইনের প্রয়োগ করেছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্ট্যারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ৮০টিরও বেশি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়কে হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহে এপ্রিলে বিরোধী দলীয় সমর্থক ও ৮২ বছর বয়সী সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করা হয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে সরকার ব্যাপকভাবে নিপীড়নমূলক আইনের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতারের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে গত বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে এই আইনে ৩৫ ও ২০১৪ সালে ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হলেও গত বছর ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতারের লক্ষ্য ছিল সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট ও অন্যান্যরা।

অক্টোবরে পার্লামেন্টে বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত একটি আইন পাস হয়। এই আইনে বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম সীমিত করা হয়। সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকলে এনজিও`র নিবন্ধন বাতিলের হুমকি দেয়া হয়।

অ্যামনেস্টি বলছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াত-ই- ইসলামীর সমর্থকসহ বিরোধীদের গুমের পরিমাণ ভয়াবহ পরিমাণে বেড়েছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে গত বছর ৯০ জন আটক হলেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ২০১৬ সালে হামলা চালিয়ে অন্তত ৩২ জনকে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে সেক্যুলার অ্যাক্টিভিস্ট, লেজিবিটি সদস্য ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন রয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদার অনুসারী জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসার আল ইসলাম এসব হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে।

এপ্রিলে সেক্যুলার অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত দুই বছরে নিহত অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে নাজিমুদ্দিন ষষ্ঠ। বাংলাদেশে সমকামীদের একমাত্র ম্যাগাজিন রুপবানের সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু তনয় মজুমদারকে কুপিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। এছাড়া মানবাধিকার কর্মীরা প্রতিনিয়ত হুমকির শিকার হচ্ছেন। তারা বলছেন, পুলিশ যথাযথ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ব্রিটেনের এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন বলছে, বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার নারীরা খুব কমই বিচার পেয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ে ও কার্যকর তদন্ত না হওয়াই এর প্রধান কারণ। এছাড়া অনেক নারী ও মেয়েশিশু

ধর্ষণের অভিযোগ আনতেও অনিচ্ছুক। পুলিশি হয়রানি ও কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে অনেকে অভিযোগ করতে অনীহা দেখান।

গত বছর বাংলাদেশে ৬৭১টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানিয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে অ্যামনেস্টি প্রতিবেদনে দাবি করেছে।

  •