অন্তর্দ্বন্দ্বে পুড়ছে ক্ষমতাসীন শিবির, হতাশার সাগরে বিরোধীশিবির

প্রকাশিত: ২:১২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

অন্তর্দ্বন্দ্বে পুড়ছে ক্ষমতাসীন শিবির, হতাশার সাগরে বিরোধীশিবির

রাজনীতি মাঠে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দুই শিবিরই সমস্যায় ভুগছে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংঘাত ও হানাহানি বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে হতাশা আর দৈন্যতা বাড়ছে। তবে বিরোধীশিবিরেও দলীয় কোন্দল নেই সেটাও বলা যাবে না। বিরোধীশিবিরে মাঠের চেয়ে নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব বেশী। এটা দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ক্ষমতাসীন শিবিরে সেই দ্বন্দ্ব অহরহ রক্তক্ষীয় সংঘর্ষ আর হানাহানিতে রূপ নিচ্ছে। এতে গ্রামে-গঞ্জের, পাড়া-মহল্লার রাজনীতি ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংঘাত ও হানাহানিতে গত বছর নিহত হয়েছে দলটির ৮৩ জন নেতা-কর্মী। আর চলতি বছরে গত এক মাসে নিহত হয়েছে চারজন।

এদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুত করার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন স্থানে দলের ভেতর বিরোধ তৈরি হয়েছে, যার জের এখনো রয়ে গেছে।

এছাড়াও এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণেও বিরোধ বা সংঘর্ষ হচ্ছে। কিন্তু এসব কমাতে যতটা কঠোর হওয়ার কথা, দল ততটা হতে পারছে না। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে হানাহানির ঘটনায় চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কম। কোনো ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তাৎক্ষণিক সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও পরে তা চূড়ান্ত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়নি বললেই চলে।

২১০৬ অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। সম্মেলনের আগে সারা দেশের তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। ফলে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সংঘাত, দখলবাজিসহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত অনেক নেতা পার পেয়ে যান বলে দলীয় সূত্র জানায়।

সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগেও লোক দেখানো বহিষ্কারের ঘটনা দেখা যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক দিন পর বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা আগের অবস্থায় ফিরে আসেন।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরের পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার দায়ে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলমকে সাময়িক বহিষ্কার করে দল। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয় নির্মলেন্দু চৌধুরীকে। সাধারণ ক্ষমার আওতায় জাহেদুল দলে ফিরে আসেন। এরপর নির্মলেন্দু ও জাহেদুল দুজনই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কার্যক্রম চালাতে থাকেন। এরপর গত ১৭ জানুয়ারি নির্মলেন্দুকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠায় জাহেদুলের লোকজন। এ ঘটনায় মামলা হয় জাহিদুলসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। এরপর জাহেদুল আলমকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, কাদের সিদ্দিকী ও মোস্তফা মহসীন মন্টুর মতো বড় অনেক নেতাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সেটা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। আর দলীয় নেতাকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত এবং কারাবন্দী টাঙ্গাইলের সাংসদ আমানুর রহমানকে জেলা আওয়ামী লীগ সাময়িক বহিষ্কার করেছে। তবে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো বা তদন্তের পথে হাঁটছে না বরং মামলার চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে, কোনো সদস্য আওয়ামী লীগের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দলের কার্যনির্বাহী সংসদ যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। এতে আরো বলা হয়েছে, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কেবল আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল ছিল আওয়ামী লীগের জন্য বেশ ভ্রাতৃঘাতী। এর মূল কারণ ছিল স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন। গত বছর জুনে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, ছয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে সারা দেশে সহিংসতায় নিহত হয় ১১৬ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক ৭১ জন, যাঁরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে প্রাণ হারান।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলার বেড়াজালে আটকে দেয়। জনগণের ভোট চলে যায় নির্বাসনে, বিধ্বস্ত হয়ে যায় বিএনপি।

এরই মধ্যে মামলার বেড়াজালে পড়েছে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা। জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কয়েক মাসের মধ্যেই রায় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনও হতে পারে এ রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হতে পারে।

কারাগারে যেতে হলে তাকে ‘সাময়িক’ রাজনীতি থেকেও দূরে থাকতে হতে পারে। সরকারও চাচ্ছে এমনটিই। খালেদা জিয়া নির্ভর দলটির দশা তখন কী হবে এমন ভাবনাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। কেননা, দল ক্ষমতার বাইরে এবং ম্যাডাম জিয়ার উপস্থিতিতেই দলের নেতাদের মধ্যে যে ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে, আর কোনো কারণে ম্যাডাম জিয়া অনুপস্থিতি ঘটলে কী হবে এমন চিন্তা করছে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে।

এছাড়াও দীর্ঘ ১০ বছরেও যে দলটি নিজেদের গুছাতে পারেনি, তারা কীভাবে এমন একটি একরোখা সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসবে। ফলে ক্ষমতার পট পরিবর্তন নিয়েও বিরোধী শিবিরে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

এরই মধ্যে হতাশায় দল থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়েছেন এমন একজন নেতা বলেন, সামনে কোনো সম্ভবনা দেখছি না। ফলে জুলুম নির্যাতন থেকে বাঁচতেই আমাকে বাধ্য হয়ে রাজনীতি থেকে সরতে হলো। অথচ এক সময় আমি রাজশাহীর রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতাম। কিছুই করার নেই আমরা পরিস্থিতির শিকার।

  •