ব্যাংক জালিয়াতরা অধরা

প্রকাশিত: ২:০৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৭

ব্যাংক জালিয়াতরা অধরা
আবদুল্লাহ জেয়াদ : সীমাহীন দুর্নীতি ও ঋণ জালিয়াতিতে দেশের ব্যাংকিং খাত ডুবতে বসেছে। এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও এই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না অধিকাংশ ব্যাংক। দিনদিন তা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। আর এই যখন অবস্থা তখন সব নেতিবাচক রেকর্ড ছাপিয়ে যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে কখনও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক ব্যবহার করে এমন চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবু খোয়া গেল জনগণের ট্যাক্সের বিপুল অঙ্কের অর্থ। : হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের অর্থলুটসহ বড় জালিয়াতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা আইনের আওতায় আসলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন পরিচালকরা। তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয় সরকারও। ফলে এ পর্যন্ত কোনো কেলেঙ্কারির দায়ে কোনো পরিচালক বা প্রভাবশালী কেউ আইনের আওতায় আসেনি। অথচ এভাবে আর্থিক খাত থেকে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বেসিক ব্যাংক ও হলমার্ক সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক। : ২০১২ সালের সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালের বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে লুট হয় আরো প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ডেসটিনির অর্থ জালিয়াতির পরিমাণ চার হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের কারও সাজা হয়নি। ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য খুবই বেদনাদায়ক ও লজ্জাকর বছর এবং চাঞ্চল্যকর অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বছরটি বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথম রিজার্ভ চুরির মতো বড় ঘটনার সাক্ষী। শুধু তাই নয়, ঘটনার গুরুত্ব বেড়েছে আরও দুই কারণে। চুরি হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় অর্থ বের করে নেয়া হয় আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটের মাধ্যমে। যার বিশ্বস্ততা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ছিল না। এছাড়া বছরের শুরুতে তিন ব্যাংকের এটিএম বুথে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। : শুধু ব্যাংক নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও বছরটিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ২০১৬ সালে দুই আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ম ভেঙে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন পরিচালকরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে ৭০৩ কোটি টাকা নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। আর পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ৫৭০ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ পরিচালক। এসব অনিয়মের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান দুটির বেশির ভাগ পরিচালককে অপসারণ করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে প্রতিষ্ঠান দুটির চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের পাশাপাশি মালিকানাও বদল হয়েছে। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। মালিকানা বদল হলেও পিপলস লিজিংয়ে আবার ঋণ দেয়ায় অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরেই ব্যাংকগুলোতে নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। এখন নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও (এনবিএফআই) অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়ছে। যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। : এযাবতকালের ব্যাংকিং খাতে কোনো কেলেঙ্কারিতেই ব্যাংকের পরিচালকদের আইনের আওতায় আসতে হয়নি। কিন্তু হলমার্ক, বেসিক, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন সারির কর্মকর্তারা জেল খেটেছেন। অপসারিত হয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক এমডি ও অগ্রণীর প্রধান নির্বাহী। কিন্তু অগ্রণীর পর্ষদের কেউ আইনের আওতায় আসেননি। হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ জেলে থাকলেও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম জামিনে আছেন। ডেসটিনির সভাপতি রফিকুল আমীন আটক হলেও অসুস্থতার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে আছেন। আর বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। মামলায় নাম পর্যন্ত নেই। : দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারি হলমার্কের ঘটনা। এখানে টাকা তুলে নেয়ার সুযোগ করে দেন ব্যাংকের পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুম সরওয়ারের নাম বলেছিলেন। সোনালী ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠনের সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু আলোচিত ও বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। এসব জালিয়াতিতে প্রায় ৩২ হাজার টাকারও বেশি অর্থ লুটপাট হয়েছে। লুটের অর্থ উদ্ধারে খুব বেশি পদক্ষেপ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা জনগণের করের টাকায় মূলধন যোগান দিয়ে এসব ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা সব সময় এর বিরোধিতা করে থাকেন। : রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের একটি অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্নভাবে প্রমাণও পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা অপরাধী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। শাস্তি না পেলে অপরাধীরা উৎসাহ পাবেন। আর শাস্তি মানে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়। অপরাধের শাস্তি দিতে হবে ফৌজদারি আইনে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কিছুটা শাস্তির আওতায় আসলেও তারা পার পেয়ে যান। আবার বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনিয়মে জড়িত থেকেও নিজেদের দাপট আর প্রভাবে তারা রেহাই পেয়ে যান অদৃশ্য কারণে। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়ে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম। : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক থেকে শুরু করে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি, অগ্রণী ব্যাংকের লুটের ঘটনায় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত লোকজন জড়িত ছিলেন বলা যায়। তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে কর্মকর্তারা অনেকেই সাজার আওতায় এসেছেন। কিন্তু শুধু কর্মকর্তাদের সাজা দিলে হবে ন, সবাইকে সাজা দিতে হবে। এর পর বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির জন্য ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তবে এ তালিকায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নাম রাখেনি দুদক। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, অপ্রতুল জামানতের বিপরীতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ দেয়ার জন্য চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুই দায়ী বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য পায়। দেশের ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া জালিয়াতির বিচার না হওয়ায় এ খাতে ক্রমেই বিশৃঙ্খলা বাড়ছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। সংস্থাটি মনে করছে, এর আগে ব্যাংকে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারির বিচার হলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এমতাবস্থায় সঙ্কট নিরসনে আগামীতে এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে সিপিডি।
  •