বিস্তর আপত্তি সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যান নয়, ইসিকে চাপে রাখার কৌশলে বিএনপি

প্রকাশিত: ১২:৪১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৭

বিস্তর আপত্তি সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যান নয়, ইসিকে চাপে রাখার কৌশলে বিএনপি

নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ এনেছে বিএনপি। একইসঙ্গে এই নির্বাচন কমিশনের অধিনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয় বলে মনে করছে দলটি।

মঙ্গলবার রাতে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৈঠক শেষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক ব্রিফিংয়ে সুস্পষ্টভাবেই এসব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের প্রতিফলন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মোহাম্মদ নুরুল হুদার নেতৃত্বে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সব মহল থেকে দাবি ছিল সার্চ কমিটির বাছাই করা ১০ জনের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে এবং তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত ও কর্ম অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হবে। এ পন্থা অনুসরণ করা হলে প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা পেত। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা নিরাশ ও হতাশ হয়েছি।’ তিনি বলেন, শেষ মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় সন্দেহ হলো কাদের কমিশনে রাখা হবে, সেটি ছিল শাসক মহলের পূর্বপরিকল্পিত। এ প্রসঙ্গে ‘রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নেব’ প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তির উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ বক্তব্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন। কারণ, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুটো বিষয় ছাড়া (প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ) অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য। সংগত কারণেই আমরা মনে করতে পারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে।’

নবনিযুক্ত সিইসির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, কে এম নুরুল হুদা যুগ্ম সচিব হিসেবে চাকরিজীবন শেষ করেন। অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব হয়েছেন শুধুই কাগজে। অভিজ্ঞ সচিব ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এই ঘটনা অভূতপূর্ব। রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এমন হওয়ার কথা নয়।

২০০১ সালে যুগ্ম সচিব পদে থাকতে খান মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে চারদলীয় জোট সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়—একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এই তথ্য থেকেই ধরে নেওয়া যায়, আমাদের দল (বিএনপি) সম্পর্কে তাঁর মনে ক্ষোভ থাকতে পারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতে পারেন। এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি কতটুকু নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবেন, সে ব্যাপারে জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। একটি নির্বাচন কমিশনের যাত্রা শুরুতে আস্থার সংকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ আছে, কে এম নুরুল হুদা ১৯৯৬ সালে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে বিএনপি সরকারবিরোধী জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক ছিলেন। কর্মরত সরকারি কর্মকর্তার এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া সরকারি চাকরিবিধির লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড নামের সরকারি একটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সরকারের লাভজনক পদে কাজ করেছেন।

ফখরুল বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি শেষে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিতদের নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত না করার প্রস্তাব করেছিলাম এই জন্য যে সাধারণত সরকারের অনুগ্রহভাজনদেরই এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমরা চেয়েছিলাম কারও কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কিংবা কারও প্রতি ক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাই হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কে এম নুরুল হুদা সম্পর্কে নেতিবাচক উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সার্চ কমিটি এবং রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় না নেওয়া খুবই রহস্যজনক।’

তার মানে কি শুধু সিইসির ব্যাপারেই আপনাদের আপত্তি—সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ব্যাপারে আমরা আমাদের বক্তব্য বলেছি। অন্য বিষয়গুলো জাতির সামনে আরও পরিষ্কার হয়ে আসবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে যদি এ অভিযোগ থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের কী অবস্থা দাঁড়াচ্ছে, আমরা তখনই বুঝতে পারছি।’

বিএনপির তালিকা থেকে কোনো নাম গ্রহণ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, ‘মাহবুব তালুকদার সাহেবের নাম আমরা দিয়েছি।’ তাহলে কি বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করছে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যা বলার বলে দিয়েছি।’

তিনি বলেন, অভিজ্ঞ সচিব ছাড়া কাউকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করার ঘটনা নজিরবিহীন। রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এমন হওয়ার কথা না। শুধু কাগজেই নুরুল হুদা অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব হয়েছেন।

বিএনপি নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তুললেও নির্বাচন কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করেনি। এতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নুরুল হুদার কমিশনকে প্রথম থেকেই চাপে রাখতে এটা তাদের কৌশল হতে পারে।

  •