বিতর্কের বৃত্তে নির্বাচন কমিশন, রাজনীতিতে ফের অশনি সংকেত

প্রকাশিত: ৪:৫২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৭

বিতর্কের বৃত্তে নির্বাচন কমিশন, রাজনীতিতে ফের অশনি সংকেত

নতুন নির্বাচন কমিশনার গঠন নিয়ে এতোদিন দেশবাসীর মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল- রাজনীতিতে সঙ্কটের বরফ গলবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন গঠনের পর তা অনেকটাই ভেস্তে গেছে বলা যেতে পারে।

কেননা, এরই মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট তাদের হতাশার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোট নতুন নির্বাচন কমিশনকে স্বাগত জানিয়েছে। নতুন ইসি নিয়ে এরই মধ্যে জমে উঠেছে বিতর্ক। ফলে রাজনীতির আকাশে ফের কালো মেঘ উঁকি দিচ্ছে।

এক মাস ধরে ৩১টি দলের সঙ্গে সংলাপ শেষে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে গত ২৫ জানুয়ারি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

সার্চ কমিটি ঘোষণার পর প্রধান বিরোধী পক্ষ প্রতিক্রিয়ায় শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে। তারা বলেছিল, এই সার্চ কমিটি দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেননা, নিজেরাই দলীয় ব্যক্তি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা দাবি করেন, সার্চ কমিটি নিরপেক্ষ। ফলে পরস্পরবিরোধী বিতর্কের মধ্যেই সার্চ কমিটি এগিয়ে যায়।

সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়া ৩১টি দলের কাছে নাম চেয়েছিল। এছাড়া দুই দফা ১৬জন বিশিষ্ট নাগরিকের মতামত গ্রহণ করে সার্চ কমিটি। এর মধ্যে ২৭টি রাজনৈতিক দল সাড়া দেয় এবং ২৫টি দল নাম জমা দেয় পাঁচটি করে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া নাম থেকে ১০ জনের নামের চুড়ান্ত তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করে সার্চ কমিটি।

এই তালিকা থেকে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চার জনকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এতে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদা এবং বাকি চারজন হলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব আলম তালুকদার, সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বেগম কবিতা খানম এবং ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী।

সব প্রক্রিয়া শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নতুন নির্বাচন কমিশন শপথ নিতে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন কমিশন ঘোষণার পরপরই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে দলগুলোর মধ্যে। দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২০দলীয় জোট প্রশ্ন তুলেছে।

কমিশন গঠনের একদিন পর মঙ্গলবার রাতে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শেষ মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় সন্দেহ হলো কাদের কমিশনে রাখা হবে, সেটি ছিল শাসক মহলের পূর্বপরিকল্পিত।

এ প্রসঙ্গে ‘রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নেব’ প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তির উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ বক্তব্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন। কারণ, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুটো বিষয় ছাড়া (প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ) অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য। সংগত কারণেই আমরা মনে করতে পারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে।’

ফলে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ এনেছে বিএনপি। একইসঙ্গে এই নির্বাচন কমিশনের অধিনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয় বলে মনে করছে দলটি।

গত সোমবার বিকেলে সার্চ কমিটি বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ জমা দেওয়ার মাত্র তিন ঘন্টার ব্যবধানে নতুন নির্বাচন গঠন এবং তাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতেই যত সন্দেহ বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের।

এই বির্তক শুধু দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সুশীল সমাজের মধ্যেও রয়েছে। এরই মধ্যে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করেছেন, ইসি সদস্য বাছাইয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। যদিও এখনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি এরপরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে, তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়টির ওপর নজর রাখছে।

বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির গঠিত নির্বাচন কমিশনে আস্থা আছে।

এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামী আলমগীর স্পষ্টভাবেই বলেছেন, যেহেতু নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়নি, সেহেতু আমাদের নির্দলীয় সরকারের দাবীর যোক্তিকতা আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

এমতাবস্থায় স্পষ্টতই বিতর্কের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ফলে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফের উত্তেজনা-উত্তাপ ছড়াতে পারে। ফের রাজপথে গড়াতে পারে এই উত্তাপ।

শুধু তাই নয়, যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশন নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারেনি। সেহেতু সহজেই অনুমেয় আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক আরো ডালপালা গজাবে। সবমিলেই দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র অন্তিম শয্যায়। সহজে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে গণ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার যে ফর্মেই থাক না কেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে। আর দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সৎ, সাহসী এবং দক্ষ একটা নির্বাচন কমিশন খুবই জরুরি। তাহলে দেশের যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তা অনেকটাই সমাধান হবে। অন্যথা সঙ্কট আরো ঘনীভুত হবে।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট