দারসুল কোরআন সুরা ‘আল-আসর’

প্রকাশিত: ১:৪১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০১৭

দারসুল কোরআন সুরা ‘আল-আসর’

মক্কী যুগে নাজিলকৃত কোরআনের শরীফের অন্যতম একটি সুরা আল-আসর। এই সুরায় মহান আল্লাহ তায়ালা কসম করে বলেছে, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।

অনুবাদঃ

কালের শপথ, নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, কিন্ত তারা বাদে,যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে হকের নির্দেশ দেয় এবং একে অপরকে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেয়।

পরিচয়ঃ

সুরা আল আসর এর আয়াত সংখ্যা-৩, রুকু-১। সুরাটির প্রথম শব্দ  العصر কে নিদর্শন হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে।

আলোচ্য বিষয়ঃ

মানুষের সফলতা বিফলতা এবং ধ্বংশের পথ কোনটি তাহা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

ব্যাখ্যাঃ

والعصرশব্দটির প্রথম অক্ষর و (ওয়াও) শপথের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একে কসমিয়া বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মজিদের বিভিন্ন স্থানে তারই কোন সৃষ্টির নামে শপথ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা কোন জিনিসের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য শপথ করেন না। বরং তিনি যে কথা বলতে চান সেই জিনিস তার সত্যতা প্রমাণ করে বলেই তিনি তার শপথ করেন।

সুতরাং এখানে কালের নামে শপথ করার অর্থ হলো এই সুরায় যে চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে যাদের মধ্যে তা থাকবে সে সব লোক ছাড়া বাকি সবই সে মহাক্ষতি ও ধ্বংশের মুখোমুখি – কাল সময় ও স্রোত তার জন্য জলন্ত প্রমাণ। কাল সাইকেলের চাকার মত ঘূর্ণায়মান। এখানে বর্তমান ভবিষ্যত ও অতীত কালকেই বুঝানো হয়েছে।

চলমান সময় ও স্রোতের শপথ করার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝানোর জন্য প্রথমতঃ যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার তাহলো এই যে, কালের সে অংশটা এখন চলছে তা আসলে দুনিয়ার কাজ করার জন্য প্রতিটি ব্যক্তি এবং প্রতিটি জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া সময় বা সুযোগ।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে,পরীক্ষার হলে পরিক্ষার্থীকে প্রশ্নের দেবার জন্য সময় বেধে দেয়া হয়। যে সেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগায়। ফলে সে ভাল ফলাফলের মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।

অনুরুপ ভাবে আল্লাহ মানুষের হায়াত বা আয়ুষ্কাল নিদিষ্ট করে দিয়েছেন। সেই নির্ধারিত আয়ুষ্কালের মধ্যেই মানুষ যদি পরীক্ষার্থীর মতো প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর এবং সঠিক পথে কাজে লাগায় তাহলে সে সফলতার মাধ্যমে আখেরাতের মহা ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারে।

সুতরাং মহাক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সে ভালো কাজ কাজ করতে হবে তা বেঁধে দেওয়া আয়ুষ্কালের মধ্যেই করতে হবে। এতে বোঝা যায় সময়ই হলো আমাদের জীবনের আসল মূলধন।

ইমাম রাযী (র) এ বিষয়ের উদাহরণ হিসাবে একজন মনীষীর উক্তি উল্লেখ করেছেন। যেমন- একজন বরফ বিক্রেতার কথা হতেই আমি সুরা আল আসরের অর্থ বুঝতে পেরেছি যে বাজারে জোর গলায় বলছিল- দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পূজি গলে যাচ্ছে। দয়া করে এমন ব্যক্তির প্রতি যার পূজি গলে যাচ্ছে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম এইটিই হচ্ছে আসলে والعصر- إن الانسان لفى خسر-   বাক্যের অর্থ।

মানুষকে যে আয়ুষ্কাল দেওয়া হয়েছে তা বরফ গলে যাওয়ার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। একে যদি নষ্ট করে দেওয়া হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতি। কাজেই চলমান সময়ের কসম খেয়ে এই সুরায় যা বলা হয়েছে তার অর্থ এই যে,এই দ্রুত গতিশীল সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে,এই চারটি গুণাবলী শূন্য হয়ে যে মানুষ যে কাজেই নিজের জীবনকাল অতিবাহিত করে- তার সবটুকুই ক্ষতির সওদা ছাড়া কিছুই নয়।

পরীক্ষার হলে যে ছাত্র প্রশ্ন পত্রের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে অন্য কাজে সময় নষ্ট করেছে,তাকে পরীক্ষার হলে টানানো ঘড়ির কাঁটা বলে দিচ্ছে তুমি নিজের ক্ষতি করছো। যে ছাত্র এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের প্রশ্ন পত্রের জবাব দেবার কাজে ব্যয় করেছে একমাত্র সেই লাভবান। إن الانسان لفى خسر  নিশ্চয়ই প্রতিটি মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।

এখানে ‘ইনছান’ শব্দটি একবচন হলেও এর অর্থ গোটা মানব জাতিকে বুঝাচ্ছে।

خسر শব্দটি মুনাফা (লাভ) এর বিপরীত শব্দ। خسر শব্দটি দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত ক্ষতি,ব্যর্থতা ও বঞ্চনাকে বুঝায়। মূলত এখানে যে ক্ষতি বা ধ্বংশের কথা বলা হয়েছে তা দুনিয়ায় ও আখেরাত উভয় জগতের ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। আর এই ক্ষতি হচ্ছে বাঁচার জন্য যে চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে সেখানে দুনিয়া আখেরাতের বাঁচার কথাই বলা হয়েছে।

  •