আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮১তম জন্মবার্ষিকী

প্রকাশিত: ১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০১৭

আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮১তম জন্মবার্ষিকী
মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮১তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা-পিতা তখন আদর করে তাঁর নাম রাখেন কমল। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী ও জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন। : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। তাঁর বাবা মনসুর রহমান তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। কলকাতার হেয়ার স্কুলে শহীদ জিয়া ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে শিশু জিয়া করাচী চলে যান। সেখানে কেটেছে তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবন। করাচীর স্কুল-কলেজে অধ্যয়নকালে শহীদ জিয়া একজন ভাল হকি খেলোয়াড় ছিলেন। স্কুলে তিনি ইংরেজিতে ভাল বক্তৃতা দিতে পারতেন। কৈশোরে নির্মেদ দেহের অধিকারী এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। করাচীর ডি জে কলেজে পড়ার সময় ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে শহীদ জিয়া যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে শহীদ জিয়া কমান্ডো ট্রেনিং লাভ করেন। ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে জিয়াউর রহমান ঢাকার অদূরে জয়দেবপুর সাব ক্যান্টনমেন্টে : ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাচে লিয়নে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগদান করেন। একই বছর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানি যান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। তাঁর ঘাঁটি ছিল ষোলশহর বাজারে। এখান থেকেই শহীদ জিয়া দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে জাতির সবচেয়ে বড় বিপদের দিনে মুক্তিপাগল দিশেহারা জনগণের কাছে একটি ‘অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বর’ তাদের হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছিল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম থেকে জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে ভেসে এসেছিল একটি কণ্ঠস্বরÑ ‘আমি মেজর জিয়া বলছি।’ সেই কণ্ঠ সেদিন অযুত প্রাণে নতুন সঞ্জীবনী মন্ত্র এনে দিয়েছিল। ২৫ মার্চ পাকসেনারা এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর যখন হামলা করল তখন আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হন, আত্মসমর্পণ করেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পাকসেনারা যখন ২৫ মার্চ ঢাকার বুকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করল, তৎকালীন ইপিআর হেড কোয়ার্টার দখল করল এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সবকিছু তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল এবং যখন ঢাকার সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে দেশের অন্যান্য জেলার টেলিফোন, ওয়্যারলেস বা অন্য সব যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ হয়ে গেল, তখন নেতারা সবাই নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য আত্মগোপন করলেন। এটা বোধকরি কারো অজানা থাকার কথা নয়। এদেশের জনগণ তখন চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছিল, একটা রাজনৈতিক নৈরাজ্য বিরাজ করছিল সর্বত্র। তখন কেউ কোনো দিক-নির্দেশনা দিতে পারেনি। কেউ জানত না কোথায় কি হচ্ছে? এদেশের ভবিষ্যতই বা কি তাও তাদের জানা ছিল না। সেদিন মেজর জিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন সামরিক অফিসার এবং ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র ৩শ বাঙালি সৈন্য নিয়ে ২৫ মার্চ রাত প্রায় আনুমানিক : ১১টার দিকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেদিন আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন ভীত, আতঙ্কিত। কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে সেদিন তাদের কেউ সে বিষয়ে কোনো দিক-নির্দেশনা দিতে পারছিলেন না। জাতির সেই চরম মুহূর্তে এবং বিপদের সময় ৩৫ বছর বয়স্ক তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, রেডিওর মাধ্যমে এ দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে, জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য আহ্বান করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, নচেৎ পাকসেনারা হত্যাকান্ড চালিয়ে এ দেশকে শাসন ও শোষণ করবে, বাইরের জগতের পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব হবে না। আমরাও স্বাধীন হতে পারব না। তাই সেদিনের মেজর জিয়া তাঁর নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র দখল করে এদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেন দেশবাসীকে। মেজর জিয়ার সেদিনের সেই কণ্ঠস্বর শুনে এদেশের জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দিশেহারা জাতির জীবনে আশার সঞ্চার হলো। সকলে বুঝতে পারল কি করতে হবে। দলে দলে সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা লাভ করলাম। : মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাসে কোনো একটি দিনও তিনি তাঁর স্ত্রী বা পুত্রের কথা চিন্তা করেননি, দেশ আর দেশের মানুষই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক চিন্তায়। যুদ্ধ শেষে জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফিরে আসেন এবং ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফের পদে বহাল হন। ১৯৭৫ সালে কয়েকবার ক্ষমতার রদবদল হয়। কিন্তু তিনি তাঁর ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কারো অনৈতিক প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হননি। তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের এদেশীয় চরেরা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে বন্দি করে। কিন্তু ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে সিপাহি- জনতা তাঁকে মুক্ত করে পুনরায় তাঁর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে এবং ক্রমে তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ব্রতী হন। গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধে এবং এদেশের মানুষের স্বতন্ত্র-জাতিসত্তা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতালাভের পর দেশের শাসনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটান, বৃহত্তর জনগণের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় ও আশা-আকাক্সক্ষা তুলে ধরেন এবং জনগণের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া জগদ্দলপাথর তথাকথিত বাকশাল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জানালা খুলে দেন, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। পূর্ণ ক্ষমতা লাভের পর বাংলাদেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পতাকা সমুন্নত রাখা, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং দেশ গঠন ও জনকল্যাণের শপথ নিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচি দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত করে। তিনি বিদেশে শ্রমবাজার তৈরি করে জনশক্তিতে পরিণত করেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশে ইপিজেডের শুভ সূচনা করেন এবং তা গণচীনের আগেই। তাঁর কর্মসূচির মধ্যে যে রাজনৈতিক দর্শন নিহিত রয়েছে তা হলোÑ উৎপাদনমুখী রাজনীতি, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, ন্যায়ভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা। এই বিষয়গুলো ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির চরম অধঃপতনের সময় মহান দেশপ্রেমের আলোকবর্তিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। পার্থিব লোভ-লালসা ও ক্ষমতার মোহ তাঁকে ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুৎ করতে পারেনি। অন্যায় ও অসত্যের কাছে তিনি কোনোদিন মাথানত করেননি। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধে বিশ্বাসী। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র যা আজ ভূলুণ্ঠিত।               : কর্মসূচি : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলে কেন্দ্রীয়ভাবে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। আজ ভোরে সারাদেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় শেরেবাংলানগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে ফাতিহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এ ছাড়া বিকেলে মহানগর নাট্যমঞ্চে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা, পোস্টার, লিফলেট ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। পত্রিকাগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে।
  •