ভূমিকম্পে কমলগঞ্জে দুই শতাধিক বাড়ি ঘরে ফাটল

প্রকাশিত: ২:১৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৪, ২০১৭

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ৭ মিনিটে স্মরণকালের ভয়াবহ ভুমিকম্পে বিভিন্ন স্থানে ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বেরিয়ে আসে ভূগর্ভস্থ বালু-পানি। উপজেলায় ফুটবল খেলার মাঠসহ অর্ধ শতাধিক স্থানের জমি ফেটে পানি ও বালি বের হয়। ভূমিকম্বেপ কমলগঞ্জ পৌর ভবন, উপজেলা প্রশাসন চত্তরে জেলা পরিষদের নবনির্মিত অডিটোরিয়ামসহ দেড় শতাধিক বাড়ি ঘরে ফাটল দেখা দেয়। অডিটোরিয়ামের পূর্বদিক দেবে গেছে। ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫জন। ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তা ও ফসলের মাঠ ফেটে পানি ও বালু বের হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ, নছরতপুর, পশ্চিম বালিগাঁও, শিমুলতলা, হীরামতি, রায়নগর, মাধবপুর, কুমড়াকাপন, চৈতন্যগঞ্জ, নারাইনপুর, চিৎলিয়া, রানীরবাজার, জালালপুর, রামপুর, কান্দিগাঁও, পতনঊষার, আদমপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের বাসা বাড়ির বিল্ডিংয়ে দেখা দিয়েছে ফাটল। এতে ভয় ও আতংকে কাটছে এসব এলাকার নাগরিকদের। ভয়াবহ এই ভুমিকম্প মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে যখন শুরু হয় তখন আতংকে লোকজন চিৎকার করে বাসা-বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসেন।
পৌর এলাকার ৬নং ওয়ার্ডে মুহিবুর রহমান এর জমির বিশাল এলাকা জুড়ে ফাটল দেখা দিয়ে ভূগর্ভস্থ বালু ও পানি বের হচ্ছে। কান্দিগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের বাড়ির বিল্ডিং এ ফাটল ও রান্না ঘরের ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ভানুগাছ বাজারের গাউছিয়া আরমান হার্ডওয়ার দোকানে ভূমিকেম্প গ্লাস ভেঙ্গে প্রায় লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বাজারের ১৫/২০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভানুগাছ পৌর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সানোয়ার হোসেন।
এছাড়া ভূমিকম্পে হেরেংগা বাজারের পশ্চিমে বনগাঁও রাস্তায় ধলাই নদির পাড়ে, পৌর এলাকার কুমড়াকাপন গ্রামের রাস্তা, রানীরবাজার এলাকার একটি রাস্তাসহ বিভিন্ন বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় লোকজনের ভিড় বাড়ছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিপ্রতিনিধিরা ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার বিকাল তিনটা সাত মিনিটে প্রথম দফায় মাটি কাঁপতে থাকে। সাথে সাথেই প্রায় ৮ থেকে ১০ সেকেন্ড স্থায়ী বড় ধরনের একটি ঝাঁকুনি দেয়। ভয়ে লোকজন ভবন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ঘটনার পর সরেজমিন কমলগঞ্জ উপজেলা সদর, কমলগঞ্জ পৌরসভা, শমশেরনগর ইউনিয়ন, আদমপুর, আলীনগর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় ভূমিকম্পে কমলগঞ্জ বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ফুটবল খেলার মাঠ, রামপাশা গ্রামের ধানি জমি, কমলগঞ্জ ভূমি অফিস সংলগ্ন ধানিজমি, আদমপুরের হেরেঙ্গা বাজার, আদমপুরের ঘোড়ামারা গ্রামসহ কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক স্থানের জমি ফেটে পানি ও বালি বের হয়। এক একটি স্থানের ফাটল কমপক্ষে ১০ ফুট থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা। ভূমিকম্পে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভবন ও জেলা পরিষদের ৫০০ আসন বিশিষ্ট নবনির্মিত অডিটোরিয়াম কাম মাল্টি পারপাস ভবনের অসংখ্য স্থানে ফাটল সৃস্টি হয়। অডিটোরিয়ামের সামনের দিকের উপরিভাগের দেয়ালের ইট খসে পড়ে। অডিটোরিয়ামের পূর্ব দিকের বারান্দা প্রায় দেড় ফুট পরিমাণ দেবে গেছে। ভবনের ভিতরের উপরিভাগের শিলিং খসে পড়ে। এছাড়াও উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক ভবনের দেয়াল, ছাদ ও প্রাচীর দেয়াল ফেটে গেছে। অসংখ্য মাটির দেয়াল ভেঙ্গে গেছে।
দেয়াল ভেঙ্গে, ইটের আঘাতে ও বৈদ্যুতিক তারের কারণে ১০ জন আহত হয়েছেন। বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে উপরে পড়ে শমশেরনগর ইউনিয়নের ভরতপুর গ্রামের মরিয়ম বেগম (৪০) আহত হয়েছেন। দেয়ালের ইটের আঘাতে কমলগঞ্জ পৌরসভার বড়গাছ এলাকার আমিন মিয়া (৪৫) ও তার স্ত্রী আহত হয়েছেন। আধাপাকা ঘরের দেয়াল ভেঙ্গে আদমপুর ইউনিয়নের উত্তর ভানুবিল গ্রামের উজ্জল সিংহ (২০) নামক এক যুবক আহত হয়েছেন। আহতদের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে গুরুতর দুইজনকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
কমলগঞ্জ বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়সহ পৌর এলাকার বিভিন্ন স্কুল খেলার মাঠের মাটি ফেটে পানি ও বালু বের হতে দেখা যায়।
এদিকে ভানুগাছ বাজারে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্টানের ব্যাপক ক্ষতি সধিত যায়। এছাড়াও কমলগঞ্জ পৌর ভবন, ৫০০ আসন বিশিষ্ট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ফাটল দেখা দেয়। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক ঘর বাড়ীর দেওয়াল ফেটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পের খবর পেয়ে পৌর এলাকার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মোঃ জুয়েল আহমদ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ রফিকুল আলম।
এ দিকে সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বাসা বাড়ির দেয়ালে ছোট বড় অনেক ফাটল। এতে করে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৪০ কি:মি: দক্ষিণ পূর্ব দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকা। কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জুয়েল আহমদ বলেন, তার জীবনে এভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে ভূমিকম্প তিনি অনুভব করেননি। তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন কমপক্ষে দেড় শতাধিক বাড়ি ঘরের ফাটল দেখা দিয়েছে। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানান, ভূমিকম্পের সঠিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে অসংখ্য বাড়ি ঘরে ফাটল, জমি ফেটে পানি ও বালি বের হওয়া, পৌর ভবনও জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ফাটলসহ দেবে যাবার সত্যতা নিশ্চিত করেন তিনি। তবে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির সার্বিক তথ্য উপজেলা প্রশাসন থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট