আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ বাড়ছে ।। র‌্যাব-পুলিশের অস্বীকার

প্রকাশিত: ১:২৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৬

মাসুদুর রহমান : দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণের ঘটনা চলছেই। কিছু সময়ের জন্য অপহরণের ঘটনা কমলেও থেমে থাকেনি। কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তা থেকে, কখনো রাতের আঁধারে বাসস্থান থেকে গুম হয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও। অপহৃতদের অনেকে কিছু দিন পর বাড়ি ফিরছে, আবার অনেকের হদিস মিলছে না, আবার কারো মিলছে লাশ। এসব ঘটনা এখন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চরম আতঙ্ক। তবে বরাবরের মতোই অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করছে র‌্যাব-পুলিশ। : মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসেবে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে মোট ১১১ জনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে এভাবে ১৬০ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এদের অনেককে পরবর্তী সময়ে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বাসার সামনেই গাড়ি থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার চালককে তুলে নেয়ার ঘটনায় রহস্যের জট খুলছে না। আসক-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ৮২ ব্যক্তি গুম-অপহরণের শিকার হন। অজ্ঞাত বা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজদের অনেকের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার দাবি করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথমত অস্বীকার করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এদের খুঁজে বের করা বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উদ্ঘাটনেরও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। যদিও নিখোঁজ ও ভিকটিমদের নিরাপত্তা এবং খুঁজে বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। প্রায় তিন বছর ধরে নিখোঁজ এমন ২০ জনের পরিবারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে স্বজনদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানানো হয়েছে। আলোচিত ২০ জনের ১৯ জনই ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্ব^র থেকে ১১ ডিসেম্বর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে নিখোঁজ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সম্পাদকীয় থেকে জানা যায়। একইভাবে ২০ জনের সবাইকেই র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জনকে র‌্যাব-১ এর সদস্যরা তুলে নিয়েছে, বাকিদেরও র‌্যাব ও গোয়েন্দা পরিচয়ে তুলে নিয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। এনিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  বলেন, দেশে গুম বলে কোনো  শব্দ নেই।  যারা গুম হয়েছেন বলে প্রচার করছে তারা নিজেরাই আত্মগোপনে রয়েছেন। : আসক-এর পরিসংখ্যান বলছে, গত আট বছরের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এ সময়ে দেশে ৮২ ব্যক্তি গুম-অপহরণের শিকার হন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে এসব ব্যক্তিকে তুলে নেয়া হয়েছে বলে তাদের স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন। পরে এদের মধ্যে ২৩ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ১০ জন ছাড়া পেয়েছেন। সাতজনকে গ্রেফতারের খবর পরে গণমাধ্যমকে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনজনকে পরে থানায় ও কারাগারে পাওয়া গেছে। বাকি ৩৯ জন এখনো নিখোঁজ। :  আসকের পরিসংখ্যান বলছে, এই গুম-খুন ও অপহরণের ঘটনা থেকে সরকারি দলের লোকজনও রেহাই পাচ্ছে না। এ বছরের ৮২ ভুক্তভোগীর মধ্যে ১১ জন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদের মধ্যে ১৮ জন বিএনপির, তিনজন জামায়াতে ইসলামীর, ১১ জন ব্যবসায়ী, আটজন চাকরিজীবী, তিনজন ছাত্র, দুজন শিক্ষক, একজন আইনজীবী, দুজন কৃষক, একজন অটোরিকশাচালক, একজন টোল আদায়কারী এবং পৌর কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য দুজন। বাকি ১৯ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে গুম-অপহরণের শিকার হয়েছিলেন ২১ জন। ২০১০-এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ জন, যাদের মধ্যে ছয়জন পরে ছাড়া পেয়েছিলেন ও একজনকে পুলিশে দেয়া হয়েছিল। পরে ছয়জনের লাশ পাওয়া যায়। ৩১ জনের খোঁজ মেলেনি। ২০১১ সালে গুম-অপহরণ হন ৫৯ জন। তাদের মধ্যে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার হলেও ৩৯ জন এখনো নিখোঁজ। চারজন পরে ছাড়া পান। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫৬। যাদের মধ্যে আটজন পরে ছাড়া পান, চারজনের লাশ পাওয়া যায়। ১০ জনকে পুলিশ হেফাজতে ও কারাগারে পাওয়া যায়। ৩৪ জন এখনো নিখোঁজ। ২০১৩ সালে গুমের শিকার হন ৭৬ জন। এদের মধ্যে ২৩ জনের লাশ পরে পাওয়া গেছে। অন্যরা এখনো নিখোঁজ। : সম্প্রতি নাটোর থেকে অপহৃত হন তিন যুবক। এর দুদিন পর দিনাজপুরে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়ার যায়। এই তিনজনই নাটোরের যুবলীগ নেতা এবং এদের একজন একটি অনলাইন মিডিয়ায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন বলে জানা গেছে। এদের র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে র‌্যাব এ দাবি অস্বীকার করেছে। গত বৃস্পতিবার চট্টগ্রামে র‌্যাবের হাতে  আটক ৫ জঙ্গির মধ্যে সামি ও নুরে আলম নামে দুইজনকে আট মাস আগে আইন শৃঙ্খলা পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পরিবারদের দাবি। : শেখ ইবতিসাম আহমেদ সামির বাবা ইফতেখার আহমেদ এনাম সাংবাদিকদের বলেন, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল ভোরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে সামিকে রাজশাহীর মোন্নাফের মোড় এলাকার নিলাভা ছাত্রাবাস থেকে তুলে নিয়ে যায়। নুরে আলমের মায়ের অভিযোগ, চলতি বছরের ১১ এপ্রিল রাতে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে নীলফামারী শহরের উকিলের মোড় মহল্লার নিজবাড়ি থেকে নুরে আলমকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০ মিনিট পরেই বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে বলে তুলে নেয়া হয় নুরে আলমকে। গত ১০ অক্টোবর ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লেক্সাস গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. বেলাল হোসেনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। বেলালের স্ত্রী রেশমা আক্তার রিতু মিরপুর মডেল থানায় জিডি করেছেন। এর আগে গত ১২ এপ্রিল ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত ৯ আগস্ট সাভারে ফিরোজ আল মামুন নামে এক ব্যক্তিকে তার উপজেলা কমপ্লেক্স সংলগ্ন বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। ফিরোজ আল মামুনের স্ত্রী নাসিমা ফিরোজ জানান, দেড় মাস পর তিনি বাসায় ফিরেছেন। কিন্তু এত দিন কোথায় ছিলেন তা বলতে পারছেন না। এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়েছিল। : পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাউকে আটক করলে ২৪ ঘণ্টার অতিরিক্ত হেফাজতে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাকে আদালতে হাজির করতেই হয়। তবে বেশির ভাগেরই আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলছেন, আমাদের আইনেই বলা হয়েছে, ডিসিপ্লিনারি ফোর্সের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আমরা তদন্ত করতে পারবো না। তাই গুমের বা নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার কোনো অভিযোগ আমরা এখনো তদন্ত করতে পারিনি। কারণ সেগুলো তদন্তের মতো সক্ষমতাও আমাদের নেই, আবার আইনি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তবে বন্দুকযুদ্ধের কিছু ঘটনা আমরা তদন্ত করে সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছি। অনেক ক্ষেত্রে তারা জবাব দিয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। আসলে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করারও থাকে না।
  •