রিজার্ভ চুরির অপার রহস্য

প্রকাশিত: ২:৪৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৬

বাবুল খন্দকার : বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনা রহস্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি হ্যাকারদের একটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ চুরি করার চেষ্টা করে। তবে পুরোপুরি সফল না হলেও ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করতে সক্ষম হয় তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করে এই অর্থ চুরি করা হয়। অর্থ চুরির পর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। বিশেষ করে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কয়েক দফা তা প্রকাশের তারিখ পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ ফিলিপাইন সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন না দেয়ার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। : অন্যদিকে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় অর্থনীতিবিদরা এর সমালোচনা করেন। সেই সাথে তা প্রকাশ করা হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। : অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দিনকালকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন ফিলিপাইনকে দেয়া না দেয়া, অর্থ আদায় তো বড় কথা নয়। আগে ক্রিমিনালকে ধরতে হবে। ক্রিমিনাল ধরা না পড়লে আরো কত অর্থ বের হয়ে গেছে বা যাচ্ছে তা বলা যাবে না। সরকারের আগে বাংলাদেশের জনগণকে তদন্ত প্রতিবেদন জানানো উচিত। তারা যদি ফিলিপাইনকে জানাতে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে তাহলে বাংলাদেশের মানুষকে জানাতে হবে। আর সরকারের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার একমাত্র কারণ দোষীদের আড়াল করা। অপরাধীদের মধ্যে সরকারের এমন কেউ রয়েছে যাকে আড়াল করতে চাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। এ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার তো আর কোনো কারণ আমি দেখছি না।’ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দিনকালকে বলেন, সরকার ফিলিপাইন সরকারকে রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন না দেয়ার মানেই হচ্ছে দেশের মানুষকে ওই প্রতিবেদন দেবে না। কারণ দেশের জনগণ যদি তদন্ত প্রতিবেদন দেখতে পায় তাহলে স্বাভাবিকভাবে বিশ্বও দেখতে পাবে। ফিলিপাইনকে এই প্রতিবেদন না দেয়ার ফলে অর্থ আদায়ে কি প্রভাব ফেলবে তা বলা এখনই যাবে না। কারণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অর্থ আইন সম্পর্কে জানতে হবে। তবে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। সরকার : তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় সবার কাছে সন্দেহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। : এর আগে গত বৃহস্পতিবার সরকারি তদন্ত কমিটির প্রধান এবং সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচজন কর্মকর্তার অবহেলা এবং অসতর্কতার প্রমাণ সরকারি কমিটির তদন্তে পাওয়া গেছে। তবে সরকারি কমিটি মে মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর কয়েক দফায় সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, দেশের স্বার্থে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। : বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের একটি চক্র রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত বলে সিআইডি পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-বিদেশিসহ শনাক্ত ২৩ : রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর সিআইডি কার্যালয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক শাহ আলম। : তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিদেশিসহ ২৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। মূল হোতাদের বের করার চেষ্টা চলছে। রিজার্ভ চুরির আগে ৫টি অ্যাকাউন্ট করা হয়। : এ ছাড়া সিআইডি পুলিশের তদন্ত দলের প্রধান শাহ আলম বিবিসিকে বলেছেন, এই চক্রটি নিরাপত্তাব্যবস্থা অরক্ষিত করে হ্যাকিংয়ে বা অর্থ চুরিতে সহায়তা করেছে। : তিনি আরো জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তারা এই চক্রটিকে চিহ্নিত করেছেন। তারা এখন নিশ্চিত হয়েছেন যে, অর্থ চুরির ঘটনায় বিদেশি চক্রকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা সহায়তা করেছে। : সিআইডি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের চক্রটি রিজার্ভের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। এর ফলে হ্যাকাররা বা বিদেশি চক্র সহজেই অর্থ চুরি করতে পেরেছে। : সিআইডি পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি এবং তদন্ত দলের প্রধান শাহ আলম বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের চক্রটি রিজার্ভের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে। ফলে হ্যাকাররা বা বিদেশি চক্র সহজেই অর্থ চুরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তাদের এবং মূল হোতা বা বিদেশি চক্রটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই সুরক্ষিত ছিল। সেই সিস্টেমকে ধাপে ধাপে দুর্বল বা অরক্ষিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা এবং দেশের বাইরের কিছু ঠিকাদার বা বিদেশিরা মিলে এই কাজ করেছে। আর এই অরক্ষিত করার ফলেই হ্যাকিং করা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা যারা সিস্টেম বা বিষয়গুলো জানেন বা বোঝেন, তারাই বিদেশিদের প্ররোচনায় সিস্টেমকে অরক্ষিত করেছেন। এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি।
  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট