মিয়ানমারে গণহত্যা চলছে

প্রকাশিত: ১১:৫২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৬

মিয়ানমার মানে নিশ্চিত মৃত্যু, সেখানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে অত্যাচার-নিপীড়নে হত্যা করা হচ্ছে, বসতভিটা আগুনে জ্বালিয়ে শ্মশান বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারী-শিশুদের ধর্ষণ করে নির্মমভাবে মেরে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবারও বিশ্ব মিডিয়ার বরাতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে নজিরবিহীন মুসলিম নির্যাতন অব্যাহতের একাধিক খবর পাওয়া গেছে। সেখানে চলছে নির্বিচারে গণহত্যা। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর ত্রিমুখী নৃশংসতায় দিশেহারা রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমরা। তাদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষীদের নির্যাতন-নির্মমতা ইতিপূর্বেকার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বিভীষিকাময়। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বিশ্ব মিডিয়াকে জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে, কুপিয়ে-পিটিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে, গাছে ঝুলিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায়, গুলি করে, পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, নারী-শিশুদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে। বনে-জঙ্গলে পালিয়েও রেহায় পাচ্ছে না কোনো রোহিঙ্গা। স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও সরকারি বাহিনী সমানে রোহিঙ্গা বিরোধী নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে অঞ্চলটিতে মগদের বাসস্থান হওয়ায় একে মগের মুল্লুকও বলা হয়ে থাকে। এখানে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের ওপর নির্যাতন ঐতিহ্যগত। গত কয়েক দিনে সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মুসলিম নিধনের ভয়াবহ চিত্র ইতিমধ্যে বিশ্ব মিডিয়াগুলোতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘসহ বৃহৎ দেশগুলোর অবস্থান গ্রহণের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এদিকে রাখাইন রাজ্যের ঘটনায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, প্রবেশ রোধে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক রয়েছে। টেকনাফ সীমান্তে অতিরিক্ত ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।  রাখাইন রাজ্যের খিয়াড়িপাড়া গ্রামের মো: ইসলাম (৭২) জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে বাঁচার জন্য তিনি তার পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে সোমবার ভোরে নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নেন। তার অভিযোগ, নির্যাতনের ভয়াবহতা এতই ব্যাপক যে, সে দেশে বর্তমানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা যেন জীবন্মৃত। আর যেসব রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে রাখাইন প্রদেশ ছেড়ে যে যেভাবে যেদিকে পারে পালিয়েছে। তারাও অনাহারে অর্ধাহারে ঝোপঝাড়ে, জঙ্গলে ও সীমান্ত ছাড়িয়ে আত্মরক্ষা করেছে। অনেকেই তাৎণিক হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে নৌকা নিয়ে সাগরে যাত্রা করেছে। সেখানেও নৌসেনাদের হাত থেকে রেহাই নেই। যারা কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা সাগরে ঘুরতে ঘুরতে পানি ও খাবারের অভাবে মারা যাচ্ছে। নির্যাতিতরা অনেকেই মোবাইলে তাদের করুণ পরিণতির কথা ও ছবি তুলে জানাচ্ছেন। : মংডুতে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বসবাসরত আত্মীয়দের জানিয়েছে, মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা শত শত রোহিঙ্গা পুরুষদের ধরে নিয়ে গেছে। এদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে অমানবিক। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তা জানা নেই। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন প্রদেশের মংডুর উত্তরে চলমান এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি গ্রাম নারী-পুরুষশূন্য হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তাদের কাছে খাদ্যসামগ্রীও পৌঁছতে দেয়া হচ্ছে না। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্মমভাবে ধর্ষণ করছে। : স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বিকেলে মংডুর উত্তরে কেয়ারিপ্রাং এলাকার তিন রোহিঙ্গা যুবতীকে ধর্ষণ করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন। ওই গ্রামের কাছাকাছি স্থান ধুদাইং এলাকার একটি পাড়া শনিবার বিকেলে ঘিরে ফেলে সেনাসদস্যরা। পরণে যুবতী-কিশোরীদের প্রত্যেককে একেকটি ঘরে প্রবেশে বাধ্য করে। মহিলারা ঘরে প্রবেশ না করে ভয়ে এক স্থানে একত্র হন। এদের মধ্যে থেকে ধুদাইং এলাকার হাজী করিমুল্লার মেয়ে ওয়াজেদা বেগমকে (১৭) নির্জন স্থানে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। রবিবার সকালে ওই কিশোরীর লাশ পাওয়া যায়। :  সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা সেনা সদস্যদের অত্যাচার থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পাহাড়ের পাদদেশে বা লবণের মাঠে নিজেদের ব্যবহৃত কাপড়ের তাঁবু গেড়েছে। যেসব রোহিঙ্গা পরিবার পুরনো বসতভিটা ছেড়ে যায়নি, তাদের বাড়িঘরে গিয়ে তল্লাশির নামে সেনা সদস্যরা ঘর ও দোকানের মূল্যবান মালামাল লুট করার পাশাপাশি গৃহপালিত গরু-ছাগল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মংডুর উত্তরে হাতিরপাড়া, নাইছাপ্রাং, কেয়ারিপ্রাং, ধুদাইং, জাম্বুুনিয়া, গৌজুবিল, রাম্ম্যাউবিল, কুজাবিল, রাহবাইল্যা, বুড়াসিকদারপাড়া, লংডুং ও বলিবাজার এবং রাচিদং জেলার মেরুংলোয়া, ধুংছে, ওয়াস্যং, রড়ছড়া, আন্দাং, কেয়ান্দং এলাকায় রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে বেশি। ওইসব এলাকায় শুক্রবার মসজিদগুলোতে জুমার নামাজ আদায় করতে বেশির ভাগ রোহিঙ্গাকে যেতে দেয়া হয়নি। সেনাসদস্যরা দেশটির রাখাইন যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং দেয়া শুরু করেছে। এতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরো বেশি ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনুরূপ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বৌদ্ধ ভিুদেরর। রবিবার পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী গত ১০ অক্টোবর থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যে চিরুনি অভিযান চলছে এতে প্রায় ৩০ হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা পুরুষ ও যুবককে। প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলিম। ধর্ষিত হয়েছে অসংখ্য নারী। এখনো রাখাইন প্রদেশের মংডুতে দিনে-রাতে জারিকৃত কার্ফ্যু অব্যাহত রয়েছে। রাখাইন প্রদেশের মংডু জেলার উত্তরে ঘটনার ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় সাত দশক আগে থেকে সাবেক আরাকান (বর্তমান রাখাইন) প্রদেশে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের সূত্রপাত। নানা অজুহাতে ছলচাতুরিতে সে দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরীরা বারবার হামলে পড়ছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর। বর্বর-অমানবিকতার সব রেকর্ড ছাড়ানোর কথা ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে, অনুরোধও জানানো হয়েছে জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের শক্তিশালী সরকারের পক্ষ থেকে; কিন্তু মিয়ানমার সরকার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অনুরোধকে উপেক্ষাই করে চলেছে। উপরন্তু রোহিঙ্গা নিধন অভিযানের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জারিকৃত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তিনটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। (১) তাইরেন্স (প্রথম শ্রেণির নাগরিক) (২) নাইংচা (প্রাকৃতিক নাগরিক) (৩) নাইংক্রাচা (অথিতি নাগরিক); কিন্তু এই তিন ক্যাটাগরির কোনো একটিতে রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাদের কাছে এখন যে কার্ড (পরিচয়পত্র) আছে তার ওপর লেখা রয়েছে বাঙালি লুমিউ অর্থাৎ (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত)। এ ঘোষণার ফলে রোহিঙ্গাদের কারো কাছে নাগারিকত্ব কার্ড না থাকায় রোহিঙ্গারা দেশবিহীন জাতিতে পরিণত হয়। এই পর্যন্ত ১৯ বার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন অভিযান চালায় মিয়ানমারের বিভিন্ন বাহিনী। এসব অভিযানের লক্ষ্যই ছিল রোহিঙ্গাদের স্বদেশভূমি থেকে বিতাড়িত করা। সর্বশেষ ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে হামলার অভিযোগে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা্যুত করার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা হাতে নেয় সে দেশের সরকার। : এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু থেকে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটিশভিত্তিক গণমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছে, মিয়ানমারে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যু, তাই তারা বাংলাদেশেই থেকে যেতে চান। বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালালেও বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় এসে আশ্রয় নিচ্ছেন রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমরা। রবিবার রাতেও নৌকায় করে টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় এসেছেন অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গা। এদের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির সংবাদদাতা। : জানা গেছে, রাখাইনের সহিংস পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে রবিবার রাতে একটি নৌকায় করে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা দেন অন্তত ২০ জন রোহিঙ্গা মুসলমান। কিন্তু নাফ নদীর মাঝপথে তাদের নৌকা ডুবে যায়। তখন অন্য একটি নৌকা এসে তাদের বাঁচালেও ৭ জন যাত্রী এখনো নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। প্রাণভয়ে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তে আসার সময় তিন সন্তানকে হারিয়েছেন হুমায়ুন কবির ও রোকেয়া বেগম। হুমায়ুন কবির বলেছেন, তিনি আর মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান না, যেভাবেই হোক বাংলাদেশেই থেকে যেতে চান তারা। ‘ওইখানে খারাপ ছিলাম না। কিন্তু এখন সেখানে যে পরিস্থিতি থাকার মতো অবস্থা আর নাই। ওইখানে ফিরে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু’ – বলছিলেন হুমায়ুন কবির। মি: কবির বলছেন, তাদের সাথে আরও অনেক রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কয়েকটি নৌকায় তারা রওনাও দিয়েছিল। কিন্তু তাদের এখন কী অবস্থা, জানেন না তিনি। হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী – মংডুতে তাদের গ্রামে আর কোনও রোহিঙ্গা মুসলিম খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই প্রাণভয়ে পালিয়ে আছেন কোথাও। নয়তো বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে। টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন হুমায়ুন কবির, তার স্ত্রী রোকেয়া বেগমসহ ১৩ জন। তাদের সাথে আসা মোতায়রা বেগমও নাফ নদীতে তার সন্তানকে হারিয়েছেন, নৌকায় আসার সময় মোতায়রার একমাত্র সন্তানও ডুবে গেছে। হ্নীলায় এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছেন মোতায়রা ও তার স্বামী। মোতায়রা বেগম অভিযোগ করে বলেছেন, রাখাইনে যে অত্যাচার-নির্যাতন চলছে তা বলে বুঝানো যাবে না। ‘সেনাবাহিনীর মানুষ এসে ঘরের দরজা আটকায়ে আগুন দেয় আর বলে এরা রোহিঙ্গা মুসলিম। কোনোভাবে যদি কেউ বাড়ি থেকে পালাতে চায় তাহলে তারা গুলি করে’। রাখাইনের মেয়েদের ওপর ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন এ রোহিঙ্গা মুসলিমরা। : মোতায়রা বেগম অভিযোগ করে বলেছেন, রাখাইনে যে অত্যাচার-নির্যাতন চলছে তা বলে বুঝানো যাবে না। রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাব সত্ত্বেও সীমান্তের ওপারে চরম সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে পড়া মানুষদের প্রতি বাংলাদেশিদের সহানুভূতি বাড়ছে বলে বিবিসির সংবাদদাতা জানাচ্ছেন। তবে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের দাবি বরাবরই ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করে থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মিয়ানমার সরকারের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘রাখাইনে যা ঘটছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা’।

  •