একতরফা কমিশন জনগণ মানবে না : গোলটেবিলে বক্তারা

প্রকাশিত: ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৬

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক নেতা, সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে সবার মতামত নিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন প্রয়োজন। আজকের প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের একমাত্র পথ হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্থায়ী পদ্ধতি বের করা। আর এ জন্য প্রয়োজনে আইন করা যেতে পারে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বৈশিষ্ট্য কি তা আইনে উল্লেখ থাকা উচিত। নির্বাচনকালীন সময়ে ভারতের কোনো সরকার প্রধান ইসির কথার বাইরে যায়নি।  নির্বাচনের সময় যে দল ক্ষমতায় থাকবে, তারা নিরপেক্ষ না হলে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়। এতে কমিশন যতই নিরপেক্ষ হোক না কেন। আগেরবার যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেটা যথেষ্ট নয়। এটার একটা আইনি ভিত্তি দরকার। তিনি বলেন, ইসির আইন নিজেদের মতো করে ইসিতে নিরপেক্ষ লোক দিয়ে লাভ হবে না। প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে এমন ব্যক্তিদের দেয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) গতকাল আয়োজিত সিরডাপ মিলনায়তনে গোলটেবিল বৈঠকে আইনবিদসহ বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বক্তারা আরো বলেন, দেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগে কোনো আইন না থাকায় গত ৪৪ বছরে বিভিন্নভাবে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংবিধানে আইন প্রণয়নের কথা বলা থাকলেও তা আজো হয়নি। এতোদিন আইন ছাড়া নিয়োগ হয়েছে। আগামী  ইসি নিয়োগ একই প্রক্রিয়ায় করা হলে মার্চেই তাদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হবে আদালতে। সুষ্ঠু ও আইনি প্রক্রিয়ায় ইসি নিয়োগ না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দেশে অস্থিতিশীলতারর সৃষ্টি হবে। আইন নয়, ইসি গঠনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ চায় বিএনপি। আর আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে সাবেক রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে একটা ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতিও এই পথ অনুসরণ করবেন। : নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) গতকাল আয়োজিত সিরডাপ মিলনায়তনে গোলটেবিল বৈঠকে ইডব্লিউজির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুল আউয়ালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন সংগঠনের পরিচালক ড. এম. আবদুল আলীম। আর বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, সাবেক ইসি ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এসএম আকরাম, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, এশিয়া ফাউন্ডেশনের আবাসিক প্রতিনিধি হাসান এম মজুমদার, ফেমার সভাপতি মুনিরা খান, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপিকা ড. নাসিম আক্তার হোসেন, ইডব্লিউজির নির্বাহী সদস্য তালেয়া রেহমান, বেসরকারি সংস্থা ব্রতির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুর্শিদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদিকা মালেকা বানু। : আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আজকের প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের একমাত্র পথ হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্থায়ী পদ্ধতি বের করা। আর এ জন্য প্রয়োজনে আইন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার এবং সংসদ আছে তা প্রতিনিধিত্বমূলক বা নির্বাচিত না। তাদের করা আইনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সংস্থাপনেও যারা আছে তাদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচনের কথা বলে নির্বাচন প্রকল্প সৃষ্টি করেছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো জনগণের ভোট ছাড়া নির্বাচন করা। তিনি বলেন, এখানে নির্বাচন পদ্ধতি ও ইসি নিয়োগে স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। আইন কোথায় করবেন? এই সংসদ তো ভোটে নির্বাচিত না। : ড. শাহদীন মালিক বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এতোদিন আইন ছাড়াই নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগ হয়েছে। কেউ কোনো চ্যালেঞ্জ করে রিট করেননি। আইন না করে এবারও যদি সার্চ কমিটি করে সেই প্রক্রিয়ায় ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ হলে, মার্চে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি বলেন, আগে আইন প্রণয়ন করে তারপর ইসি নিয়োগ দেয়া উচিত। তা না হলে নির্বাচন কমিশন ও তাদের করা নির্বাচন প্রশ্নের মুখোমুখী হবে। বেশির ভাগ দেশেই ইসি নিয়োগের জন্য আইন রয়েছে। এই আইন করতে কোনো নোবেল পুরস্কার পাওয়া আইনজীবীর প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই শুধু বাছাই কমিটির (সার্চ) কথা বলছেন। আপনারা কেন আইন তৈরির করার বলেন না? : ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চায় না। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে যা যা দরকার আওয়ামী লীগ তা করবে। সংবিধান মেনেই নির্বাচন করা হবে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের গুরুত্ব অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না। : তিনি বলেন, বর্তমান সিইসি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কখনো কোনো কাজ করেননি, তাহলে তিনি তো নিরপেক্ষই, এতে সমস্যা কোথায়? তিনি বলেন, আমাদের রাষ্ট্রপতি খুব দায়িত্ববান মানুষ, আপনারা তার প্রতি আস্থা রাখতে পারেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট যে সার্চ কমিটি করে ইসি গঠন করেছেন, উনিও তা অনুসরণ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালেও জাতীয় ঐকমত্য হয়নি। জাতীয় পার্টি বাইরে ছিল। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইন হতে পারে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য করণীয় সব কাজ সরকার করবে। এ বিষয়ে কমিশন গঠনের ব্যাপারে আপনারা প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। : এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, শক্তিশালী ইসি গঠনে আইন প্রণয়ন জরুরি। আইন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব না। ইসির আনুগত্য হবে সংবিধান ও দেশের জনগণের প্রতি। তারা বলেন, সংবিধানে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে ইসি গঠনের কথা বলা থাকলেও তা আজও পালন হয়নি। এটাকে অনুসরণ করা উচিত। তিনি রসিকতা করে ড. শাহদীন মালিককে বলেন, আপনি আদালতে ওই চ্যালেঞ্জ করে রিটটি করবেন। : ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বৈশিষ্ট্য কি তা আইনে উল্লেখ থাকা উচিত। নির্বাচনকালীন সময়ে ভারতের কোনো সরকার প্রধান ইসির কথার বাইরে যায়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় যে দল ক্ষমতায় থাকবে, তারা নিরপেক্ষ না হলে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়। এতে কমিশন যতই নিরপেক্ষ হোক না কেন। আগেরবার যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেটা যথেষ্ট নয়। এটার একটা আইনি ভিত্তি দরকার। তিনি বলেন, ইসির আইন নিজেদের মতো করে ইসিতে নিরপেক্ষ লোক দিয়ে লাভ হবে না। প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে এমন ব্যক্তিদের দেয়া উচিত। : ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এই পৃথিবীতে এমনো দেশ আছে যেখানে ইসি ছাড়াই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হচ্ছে। : সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে যে সরকার থাকবে তার ওপর নির্ভর করছে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। টাকা, পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত করতে হবে নির্বাচনকে। দলের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। : বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইসি গঠন নিয়ে ৪৪ বছরে আমরা কোনো আইন করিনি। আগের ইসি আইনের একটা খসড়া করে দিয়েছে। এখন আইন করাটা সহজ হবে। তিনি বলেন, শুধু ইসি নয়, নির্বাচনকালীন সময়ে যে সরকার থাকবে তার ভূমিকার ওপরও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নির্ভর করে। : বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। আগে সেটা ঠিক করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার যদি নিরপেক্ষ হয় তাহলে, দুর্বল লোকও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে। : আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এসএম আকরাম বলেন, যেখানে দলে কোনো গণতন্ত্র নেই, ৩০/৩৫ বছর ধরে দলে একজনই নেতা থাকবে, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। বেড়ায় ক্ষেত খেলে কিছুই হবে না। : হাসান এম মজুমদার বলেন, এখানে সরকারের ইনসেন্টিভ থাকা উচিত। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভাল করছে। ভাল করলেও ৫ কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তবে এর মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা। তিনি বলেন, সুষ্ঠুভাবে গ্রহণযোগ্য ইসি গঠন না করা হলে দেশে ভাল  নির্বাচন হবে না। আর নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হলে দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে, হত্যা-খুন হবে। : ড. নাসিম আক্তার হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন আজও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। : তালেয়া রেহমান বলেন, আইনে নির্বাচনের সময়ে ইসিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেয়ার বিষয়টি যুক্ত করা উচিত।   : শারমিন মুরশিদ বলেন, যেখানেই হাত দেই সেখানেই বিশাল বিশাল চ্যালেঞ্জ। ইসিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে আইন জরুরি। তা না হলে প্রতি ৫ বছর পর পর আবার ধাক্কাধাক্কিতে পড়বো। : মালেকা বানু বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ইসিকে নিয়োগ দিতে হবে। : ইডব্লিউজি বলেছে, ইসি নিয়োগ প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত না। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করে তাতে ইসি নিয়োগের বিষয়টি যোগ করার সুপারিশ তাদের। সংবিধান অনুযায়ী একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা। তারা সুপারিশ করেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইনি কাঠামো দরকার। এর আওতায় থাকবে একটি সার্চ কমিটি, এর কার্যপদ্ধতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নির্বাচন কমিশনার হওয়ার যোগ্যতা ও একজন নারী কমিশনার রাখার বিধান।
  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট