মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ

প্রকাশিত: ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০১৬

মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব : টান টান উত্তেজনা ও নানা নাটকীয়তায় বহুল প্রত্যাশিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ মঙ্গলবার। এই নির্বাচনে মার্কিনিরা ভোট দেবেন তাদের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে। পাশাপাশি মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদসহ আরো কিছু পদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে প্রধান দুই দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের প্রার্থী যথাক্রমে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন নির্বাচিত হলে মার্কিন ইতিহাসে এটি হবে এক ইতিহাসÑ স্থান নির্ধারণকারী নির্বাচন। : সারা দুনিয়ার আগ্রহের চোখ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে। শেষ মুহূর্তে হিলারি ক্লিনটন ও ট্রাম্প দুই প্রার্থীই চালাচ্ছেন শেষ চেষ্টা। নিজেদের নিরাপদ অঙ্গরাজ্যগুলো বাদ দিয়ে তারা শেষ মুহূর্তে লড়াই করছেন সুইং স্টেট বা ব্যাটেলগ্রাউন্ড রাজ্য নিয়ে। শেষদিকের জরিপে হিলারি এখনো ট্রাম্পের চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে আছেন। মূল ব্যাটেলগ্রাউন্ট অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাট দল এগিয়ে আছে। আইওয়া অঙ্গরাজ্যে এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। নেভাদা দখলে প্রচারণা জোরদার করছেন রিপাবলিকানরা। দুই প্রার্থীর প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। মার্কিন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নারী কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা সত্ত্বেও হোয়াইট হাউসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। এদিকে শনিবার নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে নিরাপত্তার ভয়ে মঞ্চ থেকে নামিয়ে নেয়া হয় ট্রাম্পকে। : এদিকে হিলারি ক্লিনটনের ইমেইলে কোনো অপরাধমূলক কিছু পায়নি এফবিআই। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ইমেইল ইস্যুতে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন হিলারি। এই তদন্ত নিয়ে হিলারির নির্বাচনী ক্যাম্প এফবিআইকে বেশ কয়েকবার ভর্ৎসনাও করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ২ দিন আগে প্রকাশিত এই রিপোর্ট হিলারির জন্য স্বস্তি নিয়ে আসবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হিলারির কোনো অপরাধ খুঁজে পায়নি জানিয়ে এফবিআইয়ের পরিচালক জেমস কোমি এক কংগ্রেস সদস্যকে চিঠি দেন। সেই চিঠির ছবি প্রকাশ করে বিবিসি বিষয়টি নিশ্চিত করে। চিঠিতে কোমি বলেন, হিলারির ইমেইল পর্যবেক্ষণ শেষে এফবিআই তার আগের অবস্থানেই আছে। অর্থাৎ কোনো অপরাধ খুঁজে পায়নি সংস্থাটি। পূর্বেও তদন্ত শেষে এ বছরের জুলাই মাসে এফবিআই পরিচালক জানিয়েছিলেন, হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় নিজের ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভারে স্পর্শকাতর জিনিসপত্র রাখার ক্ষেত্রে অসতর্ক থাকলেও কোনো অপরাধ করেননি। : দ্বিতীয় দফায় ইমেইল তদন্তে এফবিআই কোনো দোষ খুঁজে না পাওয়ার খবরে নির্বাচনী প্রচারে শেষ মুহূর্তে স্বস্তি ফিরে এসেছে হিলারি শিবিরে। আবারো আটঘাট বেঁধে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। এতদিন যারা চুপসে গিয়েছিলেন এখন তারাই ফেসবুক, টুইটারসহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিলারিকে আগাম অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তারা ধরেই নিয়েছেন হিলারি নিশ্চিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। অথচ মাত্র একদিন আগেও জনমত জরিপে এগিয়ে থাকার পরও হিলারির সমর্থকরা জয়ের ব্যাপারে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারছিলেন না। অনেকে প্রকাশ করেছিলেন চরম হতাশা। এফবিআই পরিচালন জেমস কোমি রবিবার যখন দ্বিতীয় তদন্তের ফল প্রকাশ করলেন এবং জানালেন যে তদন্তে হিলারির কোনো অপরাধ খুঁজে পাওয়া যায়নি, তখনই তারা নড়েচড়ে বসলেন। এমনকি ট্রাম্পের এগিয়ে থাকার খবরে মার্কিন শেয়ারবাজারে ডলারের যে পতন হয়েছিল হিলারির ইমেইল বিতর্কের অবসান হওয়ায় রবিবার থেকেই তা আবার বাড়তে শুরু হয়েছে। অবশ্য হিলারির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ‘নাছোড়বান্দা’ ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ ঘটনা বিচারের ভার তিনি মার্কিন জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে হিলারিকে যাদের পছন্দ নয়, ডেমোক্র্যাট রেজিস্টার্ড ভোটার হিসেবে তারাও এখন দারুণ খুশি। তাদেরই একজন মার্কিন মূলধারার রাজনীতিক বাংলাদেশি- আমেরিকান একেএম নূরুল হক তার অভিজ্ঞতার আলোকে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি ট্রাম্পকে ভোট দিতে পারি না, কেননা আমি একজন রেজিস্টার্ড ডেমোক্র্যাট। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না হিলারি খুব করিৎকর্মা প্রেসিডেন্ট হবেন। কেবল মন্দের ভাল বিবেচনায় তার জন্য কাজ করছি এবং তার প্রেসিডেন্ট হওয়া প্রায় নিশ্চিত।’ : জনমত জরিপ এবং ভোটের আগাম ফলাফল বিশ্লেষণ করে নূরুল হক উল্লেখ করেন, ইলেকট্রোরাল ভোট ৫৩৮। এর মধ্যে হিলারি ৩৩৪টি এবং ট্রাম্প ২০৪টি ভোট পাবেন। যদি অলৌকিকভাবে ট্রাম্প ফ্লোরিডা (২৬ ভোট) ও নেভাদা (৩৫ ভোট) জিতেও যান, তারপরও হিলারি ২৯৯টি ইলেকটোরাল ভোট পাবেন। এক্ষেত্রে ট্রাম্প পেতে পারেন ২৩৯। প্রেসিডেন্ট হতে হলে দরকার ২৭০। অতএব অভিনন্দন হিলারিকে। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন মার্কিনির সঙ্গে কথা বলে তৈরি ঐ রিপোর্টে দেখা গেছে, কেউই হিলারির বিপক্ষে যাননি। তবে কেউ কেউ দ্বিতীয় ইমেইল বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলেছেন। কিন্তু কোনো দোষ খুঁজে না পাওয়ার পর তারা বলছেন, হিলারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের চেয়ে ভাল। আবার কেউ কেউ বলেছেন, হিলারি একজন স্ত্রী ও মা। মার্কিন প্রশাসনে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। হিলারিরই প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত। অনেকে অবশ্য ট্রাম্পকে ব্যবসায়ী ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি উল্লেখ করে তার আচরণগত সমস্যার কথা তুলে ধরেন। : এদিকে মার্কিনিদের নির্বাচনে ভোটদান থেকে বিরত থাকার জন্য ইসলামিক স্টেটের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অন্যদিকে ভোটের আগের দিন নিউইয়র্কসহ তিনটি রাজ্যে হামলার হুমকি দিয়েছে আল-কায়েদা। এ কারণে স্থানীয় সময় রবিবার রাত থেকে বাড়তি নিরাপত্তা লক্ষ করা গেছে নিউইয়র্ক সিটিতে। এদিকে ৮ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্কের ওয়েস্ট ম্যানহাটনে বিজয় উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন হিলারি সমর্থকরা। ৩৪ স্ট্রিটের জ্যাকব জেভিটস সেন্টারে এ উপলক্ষে চলছে সাজসজ্জা। বিশ্বের তাবৎ মিডিয়ার প্রতিনিধিরা সেখানে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিউইয়র্কে বিজয় উৎসব করার ঘোষণা দিয়েছেন। একই দিন সন্ধ্যা থেকে ট্রাম্প সমর্থকরা উৎসব করবেন ম্যানহাটনের হোটেল নিউইয়র্ক হিলটন মিডটাউনকে। তবে শেষ হাসি কে হাসবেন তা নির্ভর করছে ভোটারদের ওপর। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রবিবার ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজ একটি যৌথ জরিপ প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, হিলারি (৬৯) এখনো ট্রাম্পের (৭০) চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। হিলারিকে ৪৮ শতাংশ এবং ট্রাম্পকে ৪৩ শতাংশ ভোটার সমর্থন করছেন। এবিসি নিউজ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হিসেবে ১৫টি রাজ্য এবং দুটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এগুলোর কোনোটি ডেমোক্র্যাটমুখী, কোনোটি রিপাবলিকানমুখী এবং কোনোটিতে বা দুই দলেরই সমান সমর্থক ভোটার রয়েছে। এসব রাজ্যে যে দল জয় পাবে সেই দলের প্রার্থীই এবার হোয়াইট হাউসে যাবেন। ৩৫টি রাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া এবং একটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের কোনোটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য এবং কোনোটি রিপাবলিকানদের জন্য নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দুই প্রার্থীর জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলিনা ও মেইন অঙ্গরাজ্যের সেকেন্ড কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে। ডেমোক্র্যাটমুখী রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কলোরাডো, মিশিগান, নেভাদা, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া এবং উইসকনসিন। রিপাবলিকানমুখী রাজ্যগুলো হচ্ছে আলাস্কা, আইওয়া, ওহাইও, উটাহ ও নেব্রাস্কার সেকেন্ড কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট। সিএনএন জানিয়েছে, দুই প্রার্থী চারটি রাজ্যকে শেষ মুহূর্তে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব ভোটারের কাছে টানতে ঘাম ঝরাচ্ছেন তারা। ট্রাম্প নর্থ ক্যারোলিনা, নেভাদা এবং কলোরাডোতে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নর্থ ক্যারোলিনার নারী ভোটারদের পক্ষে আনতে ট্রাম্পের সঙ্গে স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পও অংশ নিচ্ছেন। হিলারি গুরুত্ব দিচ্ছেন ফ্লোরিডাকে। শুক্রবার রাতে একটি প্রচারণায় হিলারিকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে হিলারি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পছন্দ করি না। তিনি আমার জীবন সম্পর্কে কি বললেন তা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।’ ফ্লোরিডায় হিলারি ও ট্রাম্পের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে জানা গেছে। তিনি আকস্মিকভাবে ওয়েস্ট মিয়ামিতে থামেন যেখানে কিউবান আমেরিকানরা বাস করেন। শুক্রবার হিলারির সমর্থনে প্রচারণা চালান সংগীতশিল্পী বিয়ন্সে। তিনি বলেন, আপনি কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, মেক্সিকান, এশিয়ান, মুসলিম, শিক্ষিত, গরিব, ধনী কিংবা একজন নারী হোন সেটা কোনো বিষয় না। চিন্তা করে দেখুন, ১০০ বছর আগে এই দেশে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। অথচ আজ একজন নারী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। আমাদের উচিত তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা। হিলারির প্রচারণা শিবির জানিয়েছে, তিনি সোমবার মিশিগানের গ্রান্ড র‌্যাপিডস, ফিলাডেলফিয়া, নর্থ ক্যারোলিনার রালেইগে প্রচারণা চালাবেন। এছাড়া আরো কিছু ব্যাটেলগ্রাউন্ড রাজ্যও তিনি সফর করবেন। তবে হিলারির মুখপাত্র জেনিফার পালমিয়েরি বলেছেন, এখনও পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গতকাল সোমবার মিশিগানের অ্যান আরবরে হিলারির সমর্থনে প্রচারণা চালান। : সর্বশেষ জরিপে আইওয়াতে ট্রাম্প হিলারির চেয়ে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে। তিন সপ্তাহ আগের পরিচালিত জরিপে ট্রাম্প তিন পয়েন্টে এগিয়েছিলেন। শনিবার প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন ৪৬ শতাংশ ভোটার। হিলারির প্রতি সমর্থন ৩৯ শতাংশ ভোটারের। লিবারটেরিয়ান গ্যারি জনসনের প্রতি ৬ শতাংশ এবং গ্রিন পার্টির প্রার্থী জিল স্টেইনের প্রতি সমর্থন রয়েছে ১ শতাংশ ভোটারের। বিবিসি জানিয়েছে, শনিবার নেভাদার রেনোতে প্রচারণা সমাবেশের মঞ্চ থেকে তাকে টেনে নামিয়ে আনেন মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমাবেশ চলাকালে হঠাৎ করে কেউ একজন ‘বন্দুক, বন্দুক’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাম্পকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনা হয়। পরে অবশ্য অনুসন্ধান চালিয়ে বন্দুক পাওয়া যায়নি। তবে সমাবেশস্থলে থাকা এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এরপর আবার মঞ্চে উঠে তিনি বক্তব্য রাখেন।
  •