ক্ষমতার মসনদ ও হাসিনা-খালেদার ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০১৬

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলছে নানা মেরুকরণ। দু’মেরুতে অবস্থানে থাকা ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পরস্পরকে ঘায়েল করতে বিভিন্ন সময়ে নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছে। তবে বলা যায়- গত আট বছরে রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগের দিক থেকে বরাবরই শেখ হাসিনা সরকার অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যে কিছুটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই তবে সহজেই বলতে পারি- নানা বিতর্কের মধ্যেও গেল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনীতির দৃশ্যপটে অনেকটাই পরিবর্তন আসে। নির্বাচনের আগে দেশে যে সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছিল সেই অবস্থা থেকে দেশবাসী অনেকটাই পরিত্রাণ লাভ করেছিল। যদিও দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের ঠাণ্ডা লড়াই চলে আসছিল।

এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীনরা দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল দৃশ্যতঃ তারা সেই চাপও সামলিয়ে উঠেছিল।

নির্বাচনের আগে মহাজোটের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলা হলেও পরবর্তীতে সেটা ভুলে গিয়ে ৫ বছরের জন্যই ক্ষমতার মসনদে নিজেদের টিকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টারত তারা।

অন্যদিকে, বিরোধীপক্ষ ক্ষমতার মসনদ দখলে এক বছরের মাথায় পুনরায় লাগাতার আন্দোলন শুরু করে। তাতে কোনো ফল আসেনি। শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে খালেদা জিয়া পরাজিত হয়।

বলা যায়- রাজনীতিবিদদের একগুয়েমিতে দেশ আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। সংকটের গভীরতা বিবেচনায় ‘পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে চলছে।

চলমান রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান হোক এটা সাধারণ মানুষের একান্ত চাওয়া সত্ত্বেও সেটার কোনো প্রতিফলন হচ্ছে না। বরং রাজনীতির হানাহানিতে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বন্দুকযুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসব হত্যাকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না।

তবে এসব ঘটনা যে শুধু এই সরকারের আমলেই ঘটছে তা বলার সুযোগ নেই। অতীতে যেমন রক্ষিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি বিগত বিএনপি সরকার ২০০৪ সালে র্যা ব-চিতা ও কোবরার নামে এলিট ফোর্স সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথকে সুপ্রশস্ত করে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দলই এর দায় এড়াতে পারে না। যদিও ক্ষমতায় গেলে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের বক্তব্যের সুরে ভিন্ন রূপ লক্ষ্য করা যায়।

ফলে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। এখানে মানুষের জানমালের স্বাভাবিক নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার অধিকারের বিষয়টি অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধীজোট সংলাপের দাবি করে আসছে। অন্যদিকে সরকার ক্ষমতার মসনদ ঠিক রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব শক্তি প্রয়োগ করছে। ফলে দৃশ্যতঃ দুপক্ষই ‘বাঁচা মরার লড়াইয়ে’ লিপ্ত হয়েছে।

এতে বলা যায়- জেদাজেদির এই রাজনীতিতে কোনো এক সময় এক পক্ষকে হারতেই হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর হেরে গেলে তাদের অস্তিত্ব কতটা হুমকির মুখে পড়বে তা সহজেই অনুমেয়। এতে দেশের পরিস্থিতি উন্নতি না হয়ে বরং আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। যেটা আলোচনার মাধ্যমে এখনো এড়ানো সম্ভব।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ আট বছর আন্দোলন সংগ্রামের ফসল গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের অর্ধেক নেতাকর্মীই হারিয়ে গেছেন। তারা আর কর্মসূচীতে অংশ নেন না। ফলে আগামীতে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে কোনো কারণে ব্যর্থ হলে আরো অনেক নেতাকর্মী স্বল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নাই। ফলে বলা যায়- বর্তমানে অনেকটাই সঙ্কটময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে বিরোধী পক্ষ।

অন্যদিকে, কোনো কারণে ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে না পারলে যে, মহাজোটের নেতাকর্মীদেরকেও চরম মাসুল দিতে হবে। তাদের অস্তিত্বও যে হুমকির মুখে পড়বে এতেও কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি ক্ষমতাসীনরা কোনো কারণে দেশের পরিস্থিতির মোকাবেলা করে মসনদে টিকে যেতে পারে এবং আগামী নির্বাচনেও বিজয়ী হতে পারে তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় সহসাই আর ক্ষমতার পরিবর্তন হবে না।

এর মধ্যে যদি দৈববশত কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে। আর এতে ক্ষমতাসীনদের এই শাসন হতে পারে তুরস্কের মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের শাসনের মতো ১৫ বছর জন্য, হতে পারে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মত ২৩ বছর, হতে পারে মিশরের হোসনি মোবারকের মতো ৩০ বছর ও লিবিয়ার গাদ্দাফির শাসনের মতো দীর্ঘ ৪১ বছরের জন্য। তবে চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করা ক্ষমতাসীনদের জন্য খুব একটা সহজ বলে মনে হচ্ছে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন অনেকে । রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ আশঙ্কাকে একবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা রুদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বিরাজমান থাকে। কেননা, অতীতেও এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটতে দেখা গেছে।

এছাড়া ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ভারতীয় দৈনিক দা ইকোনমিক টাইমস এবং নিউইয়র্ক টাইমস এ ধরনের খবর প্রকাশ করে আশঙ্কাও করা হয়েছিল।

প্রতিবদনগুলো যে উদ্দেশ্যেই প্রকাশ করা হোক না কেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তা একেবারে অমূলক ভেবে অবহেলা করলে চলবে না।

কারণ আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে যাই তবে দেখতে পাবো- বিগত ওয়ান ইলিভেনের কয়েক মাস আগেও বিদেশি পত্রিকায় এ ধরনের আশঙ্কা ব্যক্ত করে প্রতিবেদন কিংবা সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়েছিল। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ জিয়াউর রহমানের সরকারের পতনের আগে এ ধরনের ভিনদেশি গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক রিপোর্ট আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় এবং তা নিয়ে দেশে গুঞ্জনও চলছিল বেশ কিছুদিন। এ ছাড়া বেশ কয়েকবার ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনাও ঘটে। পরে সেটি সত্যে পরিণত হয়।

এমন কী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সরকারের বিগত সময়ে কয়েক দফা সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আর সেটা উপেক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল সতর্কতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ফলে।

অতীতের এসব ঘটনা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা না থাকলেও, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে যেকোনো সময় এ ধরনের কোনো অঘটন যে ঘটবে না, এটা আমরা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না।

সার্বিক দিক বিবেচনায় তৃতীয় শক্তি দেশের জন্য ক্ষতি হলেও রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতায় রাজনৈতিক সংকটের কারণে সহিংস পরিস্থিতিতেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। আর তৃতীয় শক্তির উদ্ভবের পেছনে বিদেশিদের এক ধরনের হস্তক্ষেপ বরাবরই ছিল। আমরা যদি সাম্প্রতিককালে থাইল্যান্ড, মিশরের দিকে লক্ষ্য করি তবে এমনটিই দেখতে পাই।

ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে তা উন্নতির জন্য দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে শান্তি মিশনে সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য কর্মরত রয়েছেন, ফলে সেনাবাহিনী নিজেদের স্বার্থেই রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনা নেই। তবে এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০০৭ সালের ওয়ান ইলিভেন হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ইঙ্গিতেই। যা পরবর্তীতে মার্কিন গোপন দলিল থেকেই জানা গেছে।

আর এমনটি ঘটলে হাসিনা-খালেদা কারো জন্য শুভকর হবে না। বরং তাদের ভুলের খেসারত গোটা জাতিকে দিতে হবে। তাই আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান রাখবো, অবিলম্বে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের সুশীলসমাজ-বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন মহলের সংলাপের আহ্বানকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। অন্যথা এ ধরনের অঘটন ঘটলে কোনো পক্ষেরই যে লাভ হবে না তা আমরা অতীত থেকেই শিক্ষা নিতে পারি। বরং এর জন্য জাতিকে দীর্ঘ সময় খেসারত দিতে হয়। যেমনটি দিতে হয়েছিল স্বৈরশাসক এরশাদের ৮ বছরে।

তাই দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে শত রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যেও কিছু মৌলিক প্রশ্নে সব পক্ষকে একমত হতে হবে। তবেই জাতির বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষিত হবে।

সবশেষে বলবো- দুটি পক্ষই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে রাষ্ট্র ক্ষমতা ভোগ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ক্ষমতার মসনদ দখলের এই দ্বন্দ্ব থেকে সহজে বের হয়ে দেশপ্রেম নিয়ে জনসাধারণের কল্যাণে শাসন কার্য পরিচালনার জনগণের এমন প্রত্যাশা দৈববশত আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে ক্ষমতার এই দ্বন্দ্ব কোনদিকে গড়ায় তা দেখতে আরো কিছুসময় অপেক্ষা করতে হবে আমাদেরকে।

  •