বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে চলতে পারে না

প্রকাশিত: ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৬

সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই দেখতে পাই- মানুষ মরছে ধারালো অস্ত্রের হামলায় না হয় বন্দুকযুদ্ধে। এই মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এটা কোনোমতেই যেন থামানো যাচ্ছে না। এতে সহজেই অনুমেয়-বর্তমানে বাংলাদেশ কতটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এর আগেও দেশে রাজনৈতিক সংকট ছিলো। তবে এবার নতুন মাত্রায় যোগ হয়েছে বন্দুকযুদ্ধ।

ঘুম থেকে উঠেই সকালে শোনা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে এক যুবক বা সন্ত্রাসী কিংবা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই মিলছে তার পরিচয়, জানা যাচ্ছে নিহত ব্যক্তিটি বর্তমান বিরোধীজোটের কোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য, এইসব বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একই বক্তব্য-অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের একপর্যায়ে পলায়নের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।

তবে একটি বিষয় অবাক হওয়ার মতো যে, এই বন্দুকযুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্যও হতাহত হচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে পত্রপত্রিকা থেকে। কদাচিত কোনো কোনো ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২-১ সদস্যকে আহত দেখানো হয়। তবে বিগত চারজোট সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া কথিত বন্দুকযুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্যও নিহত হবার ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে।

প্রথমে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া, পরে অভিযান, অতপর কথিত বন্দুকযুদ্ধ। কোনো নর্দমা, খাল, বিল অথবা হাসপাতালের মর্গে মিলছে সেইসব মৃতদেহ। পরে খবর পেয়ে স্বজনরা গিয়ে লাশ শনাক্ত করছেন।

গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকেই এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এই পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই উদ্বেগজনক। অবশ্য নিহতদের পরিবারের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে মানুষকে হত্যা করছে। এমনই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাকাণ্ডের জন্য এর আগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়। তবে এবার জড়িয়ে পড়েছে পুলিশ বাহিনী।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৩২ ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১১৪জনই ক্রসফায়ারে নিহত। যাদের বেশিরভাগই সরকার বিরোধী শিবিরের নেতাকর্মী। এভাবে প্রতিদিনই মায়ের বুক থেকে সন্তান, বোনের সামনে থেকে ভাইকে, সন্তানের সামনে থেকে বাবাকে, স্ত্রীর সামনে থেকে স্বামীকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আর রাত পোহালেই শোনা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।

মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি। অন্যদিকে গুম তো রয়েছেই। ২০১৪ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১২৮ জন। এছাড়া ২০১৩ সালে ৭২ জন, ২০১২ সালে ৯১ জন, ২০১১ সালে ১০০ জন, ২০১০ সালে ১১৩ জন, ২০০৯ সালে ২২৯ জন, ২০০৮ সালে ১৭৫ জন, ২০০৭ সালে ১৮০ জন এবং ২০০৬ সালে ৩৫২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন।তবে এসব ঘটনা যে শুধু এই সরকারের আমলেই ঘটছে তা বলার সুযোগ নেই। অতীতে যেমন রক্ষিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি বিগত বিএনপি সরকার ২০০৪ সালে র‌্যাব-চিতা ও কোবরার নামে এলিট ফোর্স সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথকে সুপ্রশস্ত করে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দলই এর দায় এড়াতে পারে না।

আন্দোলনের নামে রাস্তাঘাটে মানুষ হত্যা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করছে, সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যারা মারা যাচ্ছে, এরা একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মী, না হয় সাধারণ মানুষ। তাদের বিচারের আওতায় আনতে যথেষ্ট পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার সঙ্গে কখনোই পরিবারের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে একটি অপরাধ দমন করতে গিয়ে আরেকটি অপরাধের জন্ম দেয়া এটা  কোনোভাবেই কাম্য নয়। তেমনি অপরাধ নিয়ন্ত্রণের নামে রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের প্রাণহানি কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।

এসব ঘটনায় বলা যায়- আমাদের  দেশের রাজনীতি ক্রমশ অমানবিক হয়ে উঠছে। রাজনীতিবিদরাও ক্রমশ নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। ক্ষমতার জন্য সাধারণ মানুষকে যেমন রাস্তাঘাটে পিটিয়ে মারতে পারছেন, তেমনি ক্ষমতার মসনদ স্থায়ী করতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ধরে ধরে গুলি করে হত্যাও করতে পারছেন।

আমরা যতদূর জানি, র‌্যাব যখন সৃষ্টি হয়েছিল, তখন আওয়ামী লীগ বিরোধী দল ছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়ে র‌্যাবকে দিয়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূচনা করেছিল বলে অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধেরও অঙ্গীকার ছিল তার। যদিও ক্ষমতায় বসার পর সে অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায়নি।

আজ রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চা ও আইনের শাসনের অভাবেই এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। অন্যথা এভাবে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার পাওয়া যেত না। রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসন সুনিশ্চিত হয়, তখন একদিকে যেমন অপরাধ প্রবণতা কমে আসে, অন্যদিকে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন হয় না। রাষ্ট্রে আজ নাগরিকরা নিরাপত্তাহীন। বর্তমানে ঘরের বাইরে বের হওয়া বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ফলে এসব হত্যাকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না।

বর্তমানে বিচারবহির্ভূত হত্যা আর রাজনৈতিক সহিংসতায় মানুষ হত্যার ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। দেশের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা ক্রমেই সংকীর্ণ হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতার ঘটনায় ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্র এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ (এইচআরডব্লিউ) বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবেই এসব হত্যাকাণ্ডকে বৈধ করার চেষ্টা করুক না কেন। ক্রসফায়ারের নামে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। অন্যদিকে যারাই অপরাধ করুক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনতে না পারার ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এড়াতে পারে না।

এ কথা সবার জানা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্লোগান নিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি স্বৈরাচার আর সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করে জনগণ। আজ দেশ স্বাধীনের ৪৫ বছর পরও একই হানাহানি। যে গণতন্ত্রের জন্যে এতো আত্মত্যাগ, আজ সেই গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধ কোথায়?

জোর করে ক্ষমতা দখল যেমন গণতান্ত্রিক রীতি নয়, তেমনি জনমতকে উপেক্ষা করে জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখা কোনো গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। ‘গণতন্ত্র’ মানে নিছক নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রগঠনের-প্রক্রিয়া ও ভিত্তি নির্মাণের গোড়া থেকেই জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় নিশ্চিত করা। জনগণের সেই ইচ্ছা ও অভিপ্রায় রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করা না গেলে তাকে কোনোভাবেই ‘গণতন্ত্র’ বলা যায় না।

নিজের অধিকারের উপলব্ধির মধ্যে দিয়েই অপরের অধিকার এবং নিজেদের সমষ্টিগত অধিকার ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ব্যক্তির যে-মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়, প্রাণ, পরিবেশ ও জীবিকার যে-নিশ্চয়তা বিধান করা ছাড়া রাষ্ট্র নিজের ন্যায্যতা লাভ করতে পারে না। যেসব নাগরিক অধিকার সংসদের কোনো আইন, বিচারবিভাগীয় রায় বা নির্বাহী আদেশে রহিত করা যায় না- সেই সব অলঙ্ঘনীয় অধিকার অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি। মানুষ নাগরিক হিসেবে এই সব অধিকার ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে এবং সেই সব অধিকারের সার্বজনীনতা নানান আন্তর্জাতিক ঘোষণা, সনদ ও চুক্তির মধ্যে দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই স্বীকৃত অধিকারগুলো কী বাংলাদেশের নাগরিকরা ভোগ করতে পারছেন?

ফলে বলা যায়- স্বীকৃত অধিকারগুলো নাগরিকরা যতদিন স্বাধীনভাবে ভোগ করতে না পারবে ততদিন তাদের সংগ্রাম চলবেই। আর সংগ্রামের মধ্যদিয়েই তাদের অধিকার একসময় প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই যদি কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রীতি হতে পারে না। এতে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস না পেয়ে বরং প্রতিহিংসাকে উৎসাহিত করে। এতে গুপ্তহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ বেড়ে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো- সাদা পোশাকধারী লোকের পরিচয়ে নাগরিকদের বাড়ি থেকে তুলে নেয়ার পর আর হদিস থাকছে না। কেউ আইনের পরিপন্থী কাজ করলে আইনের আওতায় তার বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু নাগরিকরা হদিসহীন হয়ে যাবে এটা কোনোভাবে সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা শুধু নাগরিকদের জন্যই হুমকি নয়, বরং তা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেখানে নেই, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিক ঘটনা।

মানবাধিকারের সুরক্ষার জন্য যেমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ অত্যাবশ্যক, তেমনি গণতন্ত্র সফলের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই সরকারের উচিত, অবিলম্বে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সেই সাথে অপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করা। এভাবে আইনের শাসন কায়েম করে নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করা গেলে, তবেই আশা করা যায় রাষ্ট্রে শান্তি ফিরে আসবে।

  •