১০ টাকার চালে হরিলুট চলছেই

প্রকাশিত: ৫:১৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০১৬

এম এ হান্নান : দেশব্যাপী ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ নিয়ে চলছে ক্ষমতাসীনদের হরিলুট। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের হুঙ্কারও থামাতে পারছে না হতদরিদ্রের চাল নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শোনা যাচ্ছে এ নিয়ে অনিয়ম। প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ সত্ত্বেও সরকার ঘোষিত ১০ টাকার চাল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হতদরিদ্ররা। এ চাল পাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকমীরাই বেশি। তালিকায় রয়েছেন বিত্তবান ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম। কোথাও ডিলারশিপ বাতিল, অভিযুক্তদের আটক করা হলেও হরিলুটে জড়িত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছেন। এ নিয়ে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন করেও লাভ হচ্ছে না। ১০ টাকার চালে অনিয়মের কথা স্বীকার করে খোদ খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে এ নিয়ে আর দুর্নীতি কিংবা বিতর্ক হবে না এমন আশ্বাস দিলেও অবাধে চলছে হরিলুট। দরিদ্রদের জন্য ১০ টাকায় চাল বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে বলে স্বীকার করলেন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সর্বশেষ গত শনিবার মদনে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণে হরিলুটের খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে ও তালিকা তৈরিতে  নেত্রকোণার মদন উপজেলার  ৮ ইউনিয়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা এর সুফলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ তালিকায় দলীয় নেতা-কর্মী, আত্মীয়-স্বজন, সচ্ছল ও একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। উপজেলার ৮ ইউনিয়নে ১৬ জন ডিলার ৪ হাজার ৩শ ৪৩ জন লোকের মধ্যে এ চাল বিতরণ করবেন। এর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ১৬ জন ডিলারই আওয়ামী লীগের লোক। তালিকার মধ্যে একই পরিবারের একাধিক নামসহ ডিলারের মা, ভাই, বোন, স্ত্রীর নাম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ও ওয়ার্ড নেতাদের স্ত্রীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে চাল বিতরণের নিয়ম থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো ট্যাগ অফিসার চাল বিতরণ করতে যায়নি। : অন্যদিকে পাইকগাছা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, পাইকগাছায় হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ডিলার ও ইউপি সদস্যের নামে থানায় মামলা করেছে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। খাদ্য পরিদর্শক মোঃ মনিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বাদী হয়ে সরকারি সম্পদ প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে হতদরিদ্রদের জন্য সরকার নির্ধারিত মূল্যে কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগে ডিলার খান দেলোয়ার হোসেন ও ৪নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ আব্দুল আজিজ বিশ্বাসকে আসামি করে মামলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, খান দেলোয়ার হোসেনের ডিলারশিপ বাতিল ও তার ঘরে থাকা মালামাল জব্দ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। : বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত  ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজি চাল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে ডিলার মোঃ ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে ইউনিয়নের ১৮ জন দুঃস্থ ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ করেছেন। : সাঁথিয়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনার সাঁথিয়ায় এখনো শুরু হয়নি ১০ টাকা দরের চাল বিক্রি। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসার বললেন, তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানান, সঠিক তালিকা প্রণয়নের পরেও তা আবার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরিষদে পাঠিয়েছেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস। : কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড নিয়ে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত আবেদন জানিয়েছেন কলারোয়ার হতদরিদ্র মানুষ। জানা গেছে, জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. রিজাউল বিশ্বাস সবগুলো কার্ডই স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের নাম তালিকাভুক্ত করেন। তার সচ্ছল প্রতিবেশীসহ নিজের মায়ের নামেও কার্ড ইস্যু করেন। যারা টাকা দিতে পারেননি তাদের কার্ড দেয়া হয়নি : গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নে বিত্তশালীদের ১০ টাকা কেজির চাল দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। : তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, ইউপি চেয়ারম্যানের অবহেলার কারণে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের এক হাজার ৪১০ পরিবার ১০ টাকা দরের চাল থেকে বঞ্চিত রয়েছে। নেত্রকোনা সংবাদদাতা জানান, ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণ কর্মসূচিতে নানা অনিয়মের কারণে সেই চাল যাচ্ছে সচ্ছল, ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পেটে। এই অনিয়মের কারণে গরিব ও হতদরিদ্ররা বঞ্চিত হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনিয়মের দায়ে কৈলাটী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী খান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির বড় ভাই মজিবুর রহমানের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। : ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চালের কার্ড নিয়ে জেলাব্যাপী চালবাজি চলছেই। ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্ব^র, দলীয় নেতা ও ডিলারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা পড়ছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দফতরগুলোতে। : ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ছাতকের সর্বত্র এ প্রকল্পে লুটপাট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে নোয়ারাই, দক্ষিণ খুরমা, সিংচাপইড়, ভাতগাঁও, জাউয়া, চরমহল্লা, ছৈলা-আফজালাবাদ, দোলারবাজার, কালারুকা, গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও, ছাতক ও ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের পৃথক সভায় চাল বিতরণে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, কথা ছিল প্রত্যেক সুফলভোগীর ভোটার কার্ডের ফটোকপি ও ছবি সংগ্রহ করে ডিলাররা সুফলভোগীর হাতে ফটোসহ ‘বিতরণ কার্ড’ পৌঁছে দেবে। কিন্তু এ নিয়ম মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করছেন ডিলাররা। : ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, ফুলবাড়ীতে চাল বিক্রির তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ায় বন্ধ রয়েছে বিতরণ কার্যক্রম। :  রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নে চাল কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই ডিলারের অধীনে ৬৪৫ জনের মধ্যে এখনো তালিকাভুক্ত ৩০০ জন চাল পায়নি। অথচ চাল বিতরণ কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে ১০ দিন আগে। :  চান্দিনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার চান্দিনায় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ছোট ভাই চালের ডিলারশিপ নিয়ে দলীয় কার্যালয়কে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। : নাটোর সংবাদদাতা জানান, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজির চাল পেয়েছেন এলাকার বিত্তশালীরা। অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যান শওকত রানা লাবু তার পক্ষে ভোট করা ব্যক্তিদের সন্তুষ্ট করতেই হতদরিদ্রদের তালিকায় ওই সব বিত্তশালীর নাম রেখেছেন। এই কারণে অনেক হতদরিদ্র ব্যক্তি চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। : জামালপুর সংবাদদাতা জানান, জামালপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, হতদরিদ্রদের হাতে কার্ড না পৌঁছানো, খাদ্যগুদাম থেকে ডিলারদের চাল কম দেয়া এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে চাল ওজনে কম দেয়াসহ কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তদারকি কর্মকর্তাদের মান্য করছে না ডিলাররা। : পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ৮ ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজি দরে চালের তালিকা নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, রাজনৈতিক নেতা ও সচ্ছল পরিবারের নামে কার্ড দেয়া ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত হতদরিদ্ররা কার্ড না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। : এদিকে গতকাল রবিবার গাইবান্ধায় হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন, হতদরিদ্রদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে চলছে ব্যাপকভাবে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাট। এর বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে। এর আগে গত শুক্রবার ১০ টাকার চালে অনিয়ম বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সংহতি। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচি থেকে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। এ সময় নাগরিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন, সরকার দু-একজন ডিলারকে মোবাইল কোর্টে সাজা দিলেও দুর্নীতিতে জড়িত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছেন। : উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে ১০ টাকা মূল্যে হতদরিদ্রদের মাঝে চাল বিতরণের কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এই কর্মসূচির আওতায় একজন কার্ডধারী মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাবেন। স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও সরকারদলীয় লোকজনের সহায়তায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট