ঐতিহাসিক সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকায়

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০১৬

তিন দশকের মধ‌্যে চীনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন শি জিনপিং।

শি জিনপিংকে বহনকারী এয়ার চায়নার স্পেশাল ভিভিআইপি ফ্লাইট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় শুক্রবার বেলা ১১টা ৩৬ মিনিটে।

বিশ্বের অন‌্যতম পরাশক্তি চীনের প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজটি বাংলাদেশের আকাশ সীমায় ঢোকার পর তাকে পাহারা দিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে আসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চারটি জেট ফাইটার।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান। এসময় তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।।

অবতরণের পর রাষ্ট্রীয় এই অতিথিকে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ‌্যমে স্বাগত জানানো হয়। লাল পাড়ের সুবজ শাড়ি পড়া একটি শিশু ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়ার পর লাল গালিচায় হেঁটে তিনি সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছান।

সামরিক বাহিনীর সুসজ্জিত একটি দল এ সময় চীনের প্রেসিডেন্টকে গার্ড অফ অনার দেয়। বাজানো হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ুয়া, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিম এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চীনের প্রেসিডেন্ট রওনা হন বিমানবন্দর সড়কের হোটেল লো মেরিডিয়ানের পথে। এই সফরে সেখানেই থাকবেন তিনি।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মোটর শোভাযাত্রাসহকারে চীনা প্রেসিডেন্টকে হোটেল লা মেরিডিয়ানে নিয়ে যাওয়া হবে।

শি জিনপিং বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে দুই নেতা কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবেন। এর পর বিকেল ৫টায় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে হোটেল লা মেরিডিয়ানে বৈঠক করবেন।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন শি জিনপিং। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন। এর আগে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বিকেল ৪টায় হোটেল লা মেরিডিয়ানে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

সফরের দ্বিতীয় দিন শনিবার সকালে চীনা প্রেসিডেন্ট রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর সকাল ১০টায় ভারতের গোয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানাবেন।

ঢাকা সফরকালে চীনা প্রেসিডেন্টের ১৩ সদস্যের সফরসঙ্গীর পাশাপাশি ৩৩ সদস্যের সরকারি কর্মকর্তা এবং ৩৪ সদস্যের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা আছেন।

১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট লি জিয়াননিয়ানের বাংলাদেশ সফরের পর দীর্ঘ তিন দশক পর কোনও চীনা প্রেসিডেন্ট এই প্রথম বাংলাদেশ সফরে এলেন।

শি জিনপিং-এর সফর সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির পলিট ব্যুারোর (সিসিসিপিসি) ওয়াং হুনিং, সিসিসিপিসির সদস্য সচিব লি জানশু, স্ট্যাট কাউন্সিলর ইয়াং জিয়েছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং জি, জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন মন্ত্রী (এনডিআরসি) জু শাওসি, অর্থ মন্ত্রী লো জিয়েই, বাণিজ্য মন্ত্রী হুচেং, চীনের পিপলস ব্যাংকের গভর্নর ঝো জিয়াওচুয়ান, আথির্ক ও অর্থনীতি বিষয়ক অফিসের পরিচালক লিউ হে, সিসিপিসির জেনারেল অফিসের নির্বাহী উপ প্রধান ডিং জুজিয়াং, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিগকিয়াং, সিসিসিপিসির জেনারেল অফিসের উপ-প্রধান ওয়াং শাওজুন, এবং সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কং জুয়ানইউ।

দীর্ঘ ৩০ বছর পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছে বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ তার এই সফরে সইয়ের জন্য সাতটি চুক্তিপত্র ও তিনটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।

তিন দশক পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সফরে অর্থায়নের জন্য উপস্থাপন করতে আরো ২৮টি প্রকল্পের তালিকাও তৈরি করেছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব আবুল মনসুর মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ বলেন, এসব প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের জন্য শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। ক্রমান্বয়ে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে এসব প্রকল্পের জন্য চূড়ান্ত চুক্তি হবে।

সারসংক্ষেপে দেখা যায়, একটি অনুদান, দুটি কাঠামোগত এবং তিনটি ঋণচুক্তি প্রস্তুত রয়েছে।

সমঝোতা স্মারকগুলোর একটি চীনের আর্থিক সহায়তায় নবম, দশম ও একাদশ মৈত্রী সেতু নির্মাণের বিষয়ে।

আরেকটি হবে দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে। এর আওতায় জরুরি অপারেশন কেন্দ্র নির্মাণ, সরকারি কর্মকর্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ হবে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তৃতীয় সমঝোতা স্মারকটি সই হবে। এর বাইরে বিনিয়োগ ও উৎপাদন শক্তিশালীকরণ, সেতু নির্মাণে বিশেষ সহায়তাসহ ২৮টি প্রকল্পের জন্য সমঝোতা স্মারক সই হবে।

এর বাইরেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্য কোনো এজেন্ডা থাকতেও পারে। দুই দেশের চূড়ান্ত সমঝোতার মধ্যে এ অর্থের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।

হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী চীনের সঙ্গে চুক্তির জন্য বাচাই করা ২৮ প্রকল্পের মধ্যে দুটি রয়েছে শিল্পোন্নয়ন প্রকল্প, রেলের উন্নয়নে পাঁচটি, সড়ক পরিবহনে চারটি, বিদ্যুতের সাতটি, জ্বালানির একটি, জীবনমান উন্নয়নে পাঁচটি এবং তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে চারটি।

সফরের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকবেন দেশটির তিনজন স্টেট কাউন্সিলর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের নির্বাহী চেয়ারম্যানসহ ২৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল।

  •  

সর্বমোট পাঠক


বাংলাভাষায় পুর্নাঙ্গ ভ্রমণের ওয়েবসাইট