দুদকের ‘সরল বিশ্বাস’ সারাদেশে তোলপাড়

জাতীয়

আলী মামুদ : সরকারি প্রশাসনকে তোষামোদ করার লক্ষ্যেই তাদের বড় ধরনের ভুলেও অপরাধ হবে না বলা হয়েছে। এটা তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্যই যে বলা হচ্ছে তা আর না বুঝার কিছু নেই। বড় ধরনের চুরির পর যদি বলা হয়, সরি, তা হলে কি মাফ হয়ে যাবে। সাংবিধানিক সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান সদ্য সমাপ্ত ডেপুটি কমিশনারদের (ডিসি) এক সম্মেলনে ঐ বিতর্কিত ভাষ্য দেয়ার পর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান হচ্ছেন নিন্দিত। দুদকের সরল বিশ্বাস তত্ত্বে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন বিষয়ক উপদেষ্টা বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, বড় বড় চুরি করে যদি বলা হয়, ভুল হয়ে গেছে তাও কি মাফ হয়ে যাবে? সুপ্রীম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি করলেও তার প্রমাণ দিতে হবে যে ভুল হয়েছে। সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন বলেন, এখন সরল বিশ্বাস বাই কন্ডাক্ট প্রসঙ্গটি আসে। তাও বিচারের বিষয়। জাতীয় সংসদের আলোচিত সংসদ সদস্য ও সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার প্রতিক্রিয়ার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গতকাল বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জানান, সরকারি প্রশাসনকে তোষামদ করার জন্যই দুদক চেয়ারম্যান এমন একটি বক্তব্য দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্নীতি করলেও কর্মকর্তাকে সুরক্ষা দেয়া।
উল্লেখ্য, বির্তকিত ১১ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম পাঁচ দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একটি বিতর্কিত বক্তব্য রাখেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি নিজেও একজন সাবেক সচিব। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। এই সম্মেলন স্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জনাব ইকবাল মাহমুদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সরল বিশ্বাসে কোন ভুল করে ফেলে, এমনকি এটা যদি একটা বড় ভুলও হয়, তাহলেও এটা কোন অপরাধ নয়। পেনাল কোডে এটাই বলা হয়েছে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাই এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ঐ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত পূর্ণ ফলাফলে তার প্রমাণ মিলেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে ঐ ফলাফলের তথ্য পান। এতে ১০০ শতাংশ ভোট পড়ার কেন্দ্রও শত শতÑ যা অবিশ্বাস্য।
ক্ষমতার অপব্যবহার নয়Ñ রাষ্ট্রপতি : দেশের উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশ যখন বন্যায় ভাসছে তখন রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ডিসিদের ৫ দিনব্যাপী সম্মেলন। অন্যবার ৩ দিনব্যাপী হলেও এবার বাড়তি আরো দুদিন ধরে চলে এই সম্মেলন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, স্পীকারসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীও ডিসিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছেন। রাষ্ট্রপতি ক্ষমতার অপব্যবহার না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ডিসিদের।
বড় ভুলও অপরাধ নয়Ñ দুদক চেয়ারম্যান : এদিকে সম্মেলনের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আয়োজিত ডিসি সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তিনি বলেছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা সরল বিশ্বাসে কোন বড় ভুল করলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। এজন্য তাদের গ্রেফতার কিংবা শাস্তি হবে না। তবে পেনাল কোর্ড অনুযায়ী সরল বিশ্বাসের বিষয়টি ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে প্রমাণ করতে হবে।
সরল বিশ্বাসে চুরি করলেও মাফ হয়ে যাবে?Ñ ব্যারিস্টার মইনুল : এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার সুপ্রীমকোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি দিনকালকে বলেন, সরল বিশ্বাসে বড় ভুল করলে বড় চুরি করলেও কি মাফ পেয়ে যাবেন। তাহলে থাকবে কি?
সরল বিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষÑ অ্যাডভোকেট মাহবুব : সুপ্রীম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, সরল বিশ্বাসে ভুল করলেও তা প্রমাণ সাপেক্ষ। দুর্নীতি করলে তা প্রমাণ হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত।

  •  
  •  

Leave a Reply