জোট ‘রক্ষায়’ বিএনপি

রাজনীতি

দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও অসঙ্গতির কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোটে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা ‘ঠেকিয়ে’ রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আজ ২০-দলীয় জোটের বৈঠক ডাকা হয়েছে। শিগগিরই বসা হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বৈঠকে বসলে দূরত্ব কমে আসবে। প্রয়োজনে ক্ষুব্ধ জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্প্রতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর বিজেপি ২০ দল ছেড়েছে। ‘অসঙ্গতি’ দূর না করলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার হুমকি দিয়েছে।

এ বাস্তবতায় দুই জোটে সংকট দেখা দিয়েছে। এ বাস্তবতায় জোটের ভাঙন রক্ষায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করেছেন। প্রাথমিকভাবে জোটের বৈঠকে নেতাদের বক্তব্য শোনা হবে। সে অনুযায়ী একটি কর্মপন্থা তৈরি করে জোটকে সক্রিয় করে তোলা হবে। প্রয়োজনে ক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। মৌলভীবাজার-২ থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও পরে সিলেট-২ আসন থেকে উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত মোকাব্বির খান শপথ নেন।

এ ঘটনায় বিএনপিসহ উভয় জোটের মধ্যে তুমুল অস্থিরতা দেখা দেয়। এরই মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বিএনপি থেকে নির্বাচিত বাকি পাঁচ জনের শপথ নেওয়ার ঘটনায় তা প্রকট হয়। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির জোটে ভাঙনের দিকটি দেখিয়ে তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে এখন আর ঐক্য নেই।

তিনি বলেন, ২০ দলে আমরা ভাঙনের সুর দেখতে পেলাম। এখন ঐক্যফ্রন্টে শুনতে পাচ্ছি নানা ধরনের কথাবার্তা। এই ঐক্যফ্রন্টে এখন আর ঐক্য নেই। পরদিন শুক্রবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিভিন্নভাবে বিএনপি ও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ তারেক রহমান লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করছেন।

তার নির্দেশে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সঠিক রাজনীতির দিকে নিয়ে যাব। সব মিলিয়ে শপথ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে, ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের অস্থিরতায় রাজনীতিতে কিছুটা বিপাকে পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এই অবস্থায় আজ সোমবার গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০-দলীয় জোটের বৈঠক ডাকা হয়েছে।

দলটির নেতারা বলেন, শপথ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর হয়েছে। দুই জোটের মধ্যে যে অস্থিরতা চলছে, তা-ও মিটে যাবে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, সবাই নিজ নিজ তাগাদা থেকে উত্তেজনা দেখাচ্ছে। দেশপ্রেমিক সবাই চায় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে, গণতন্ত্রের মাতা খালেদা জিয়াকে মুক্ত এবং সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। এসব যতদিন করা সম্ভব না হবে, তত দিন এই পজেটিভ উত্তেজনা চলতে থাকবে।

তারপরও সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সামনের দিকে এগিয়ে যাব আমরা। সে উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না আমাদের সময়কে বলেন, জোটের মধ্যে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, তা দূর করতে দ্রুত সময়ে মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে লড়াই করতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এর বিকল্প নেই।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে দলের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে যেসব অসঙ্গতি আছে, তা নিরসন করা না হলে ৮ জুন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক নেতা মনে করেন, কাদের সিদ্দিকীর এই আলটিমেটাম মানে তিনিও চান জোট আরও শক্তিশালী হোক।

এ প্রসঙ্গে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, এটা ভবিষ্যৎ আন্দোলন-সংগ্রাম-গণজাগরণের ভিত্তি সৃষ্টি করবে। ২০-দলীয় জোটের মধ্যেও ঐক্য ফেরাতে বিএনপির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আজ গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকে বসছেন ২০-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা।

জানতে চাইলে জোটের অন্যতম শরিক লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির এমএম আমিনুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কথা বলবেন। জানা গেছে, লন্ডন থেকে স্কাইপে তারেক রহমানের বৈঠকে যুক্ত থাকার কথা রয়েছে। জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া আন্দালিব রহমান পার্থকে টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে পার্থ আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমি বৈঠকে যোগ দেব না।’ তবে গুঞ্জন রয়েছেÑ আন্দালিব রহমান পার্থ শেষ পর্যন্ত এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় জোটের মধ্যে দাবি উঠেছে, বিভিন্ন সময়ে ২০-দলীয় জোট থেকে বেশ কয়েকটি দল বেরিয়ে গেছে। একটি ক্ষুদ্র অংশ ওই দলের ব্যানারে থেকে গেছে। এরা জোটের শুধু সংখ্যা বাড়িয়েছে মাত্র, তাদের কোনো কার্যক্রম নেই।

তাই জোটের শরিক অনেকেই ২০-দলীয় জোটের পরিধি কমিয়ে আনার পক্ষে মতামত দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে কল্যাণ পার্টির এমএম আমিনুর রহমানকে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০ দলের আকার ছোট করলেই ভালো হয়। নিয়ম রক্ষার জন্য সংখাতাত্ত্বিক জোটের প্রয়োজন নেই। আদর্শের আনুগত্য পোষণকারী বাছাইকৃত দল নিয়ে ছোট হলেও একটি কার্যকর জোট করা সময়ের দাবি।

এদিকে তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে দল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বেশ কয়েকটি জেলা কমিটি গঠন হয়েছে। ২৪ মে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের সম্মেলন হবে। ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে চলছে তোড়জোড়। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে দল পুনর্গঠনের সমন্বয়ক ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান। পুনর্গঠন বিষয়ে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, চেয়ারপারসন কারাবন্দি হওয়ার আগে ৮২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে ৫২টির পুনর্গঠন করা হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি আংশিক ছিল।

পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সঙ্গে যুক্ত বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, যেসব কমিটি আংশিক ছিল, তা পূর্ণাঙ্গ করা হচ্ছে। যেসব কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ওইসব কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যেখানে আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হচ্ছে তারা প্রথমে সব ইউনিট কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করবে। এর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি করবে।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একজন সাংগঠনিক সম্পাদক আমাদের সময়কে জানান, যারা কমিটির আহ্বায়ক অথবা সদস্য সচিব হয়েছেন, তারা কেউ কাউন্সিলে সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। বিএনপিসহ অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের সংশ্লিষ্ট জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন ইউনিট কমিটির সাংগঠনিক অবস্থা জানতে তারেক রহমানের নির্দেশে কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে সারাদেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

ওই সাংগঠনিক প্রতিবেদন পাঠানোর শেষ দিন ছিল গত ৩০ এপ্রিল। দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে অনেকেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সময় চেয়েছেন। তারাও দ্রুত সময়ের মধ্যে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করবে দলটি।

Leave a Reply