জবানবন্দিতে যা বলে গেলেন মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত

সারাদেশ

দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে দগ্ধ ফেনীর সোনাগাজীর সেই মাদ্রাসা ছাত্রী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। দগ্ধ হওয়ার আগে তিনি সোনাগাজী থানায় দেয়া জবানবন্দিতে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে গেছেন।

নুসরাত পুলিশকে জানান, অন্য একটি ঘটনাকে পুঁজি করে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে নিপীড়ন করত। এ হেনস্তার প্রতিবাদ করায় ৬ এপ্রিল তাকে আগুন সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়েছে।

জানা গেছে, দু’বছর আগে ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে ছাত্রীটির গায়ে চুনমিশ্রিত গরম পানি ছুড়ে মেরেছিল দুর্বৃত্তরা। এতে তার চোখ ও মুখ দগ্ধ হয়েছিল।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ছাত্রীটি সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেও এ ঘটনাকে পুঁজি করে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে নিপীড়ন করত।

এ ঘটনাকে পুঁজি করে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে বলত, ‘ওটা তো তোর লাইফে কলঙ্ক হয়ে গেছে। তোকে আর কেউ বিশ্বাস করবে না। তোর লাইফে তো আগে একটা কলঙ্ক আছে। তুই আমার সঙ্গে থাক।’

জবানবন্দিতে ছাত্রীটি আরও বলেন, ‘আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হইছে, কেউ একজন আমাকে চুন মারছে। চুনগুলো আমার চোখে পড়ছিল। সেটা নিয়ে নিউজ হইছিল। উনিও ওইটার সুযোগ নিছেন।’

ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের জেরে শনিবার আলিম পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে ছাত্রীটিকে আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে। তারা জানান, ছাত্রীটি তাদের জানিয়েছেন চুন নিক্ষেপের ঘটনার দুর্বলতাকে পুঁজি করেই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তাকে যৌন হয়রানি করত।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দাখিল পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রীটি হামলার শিকার হন। সোনাগাজী উপজেলার কাশ্মীর বাজার সড়কের সিদ্দিক বাড়ির সামনে পৌঁছলে ওতপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা পাশের দেয়ালের অপর পাশ থেকে চুন মেশানো গরম পানি ছাত্রীটির গায়ে নিক্ষেপ করে। এতে তার চোখ ও মুখ ঝলসে যায়।

তাকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে তাকে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে তিনি বাড়িতে ফেরেন। তার স্বজনরা জানান, এ ব্যাপারে থানায় জিডি করা হয়।

সন্দেহভাজন এক নারীকেও আটক করে পুলিশ। কিন্তু দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করা যায়নি। এ ঘটনার পর বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে আসে। তার চাচাতো ভাই বলেন, গরম পানি নিক্ষেপের ঘটনাকে দুর্বলতা হিসেবে নিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ছাত্রীটিকে যৌন হয়রানি করত।

বাবার বয়সী ব্যক্তির যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে ২৭ মার্চ মুখ খোলেন ওই ছাত্রী। এর জেরে ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর (১৮) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে।

এদিকে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিমের সভাপতিত্বে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সভায় রবিবার এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া সভায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর চিকিৎসায় দুই লাখ টাকা অনুদান দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।

সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে শিশু বলাৎকারের ঘটনায় ফেনী সদরের একটি মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে নাশকতা, যৌন হয়রানি ও চেক জালিয়াতিসহ ফেনী এবং সোনাগাজী মডেল থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে।

এদিকে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে বুধবার দুপুরে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। এরই মধ্যে রাত সাড়ে ৯টার দিকে নুসরাত সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন।

Leave a Reply