বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর

রাজনীতি

৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দির এক বছর পূর্ণ হলো আজ শুক্রবার। গত বছরের এই দিনে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৭৩ বছর বয়স্ক সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে পাঁচ বছরের সাজা দিয়ে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দি করা হয়। এই মামলায় গ্রেফতারের দেড় মাসের মাথায় জামিন পেলেও তাঁর মুক্তি মেলেনি। নতুন নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে আটক রাখা হয়। পরে দুদক ও রাষ্ট্রপরে একটি আবদেন শুনানি শেষে তার সাজার মেয়াদ দশ বছর করেন উচ্চ আদালত। কারাগারে এক বছর আটকের প্রতিবাদে দলের প থেকে প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর কারবাস কী আরো দীর্ঘায়িত হবে, নাকি নাটকীয় কোনো পথে তাঁর মুক্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি কী কেবলই আইনি জটিলতা, নাকি রাজনৈতিক? বিএনপি নেতারা বলছেন, কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। সরকারই তাঁকে আটকে রেখেছে, আর সরকারের ‘মর্জির’ ওপরই নির্ভর করছে বন্দি থাকা অবস্থায় দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে গণতন্ত্রের ‘মা’ উপাধি পাওয়া বেগম খালেদা জিয়ার কাক্সিক্ষত মুক্তি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া জড়িত নন। এতিমখানার লেনদেনের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া জড়িত নন ও ব্যাংকে জমা অর্থ আত্মসাৎ হয়নি বরং ব্যাংকে তা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। এছাড়াও অর্থ এসেছে বিদেশ থেকে এখানে রাষ্ট্রের কোনো অর্থ নেই। ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের যদিও অনিয়ম থাকত তবে তা প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। সে আইনে মামলা না করে মামলা করা হয়েছে দুদক আইনে। ঘষামাজা করে কাগজ তৈরি করে বেগম খালেদা জিয়ার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আইনজীবীরা। মামলায় ৩২ জন সাক্ষীর কোনো সাক্ষীই আদালতকে বলেননি এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়া জড়িত। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে টালবাহানা চলে। এক মামলায় জামিন পেলে তাঁকে আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলার রায়ের সার্টিফাইট কপি পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। হাইকোটে আপিল করলে জামিন মঞ্জুরের পর আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেন। পরে আপিল বিভাগ জামিন প্রদান করলেও অন্য মামলায় তাঁকে আটক দেখানো হয়। কুমিল্লার নাশকতার মিথ্যা মামলায় নিম্ন আদালত বারবার সময় ক্ষেপণ করে। এছাড়া মানহানির অভিযোগে ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নামঞ্জুর করে নিম্ন আদালত। এসব মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিতে হয়। কুমিল্লায় একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিল পেলেও অপর মামলায় বারবার সময় ক্ষেপণের পর হাইকোর্টেরে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জামনি নামঞ্জুর করে আদেশ দেয় আদালত। এরই মধ্যে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের সাজা দেন নিম্ন আদালত। উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। : গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেন বিশেষ আদালত। ওই দিনই আদালত থেকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। তখনকার রাজনৈতিক আবহে বেগম খালেদা জিয়ার এই দন্ড অনেকটা অনুমিতই ছিল। মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ৮ ফেব্রুয়ারির ওই দিন নেতা-কর্মীরা বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটেছিল পঙ্গপালের মতো। তাদের মুখে সেøাগান ছিল- ‘আমার নেত্রী, আমার মা, বন্দি হতে দেব না।’ : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক রাখার পর থেকে তার মুক্তির জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিয়মাতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। এর মধ্যে মানববন্ধন, প্রতীকী অনশন, জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, কালো পতাকা প্রদর্শন, বিােভ মিছিল, গণস্বার কর্মসূচি পালন করে দলটি। দেখা গেছে- বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যে মামলায় কারাগারে আছেন, সেটিতে গ্রেফতারের দেড় মাসের মাথায় জামিন মিললেও তার মুক্তির পথে বাধ সেধেছে অন্য মামলা। একটি মামলায় জামিন হলে, অন্য মামলা সামনে আসছে। এভাবেই কারাগারে পার হতে চলেছে বিএনপি চেয়ারপারসনের এক বছর। আইনি মারপ্যাঁচে তার এই কারাবন্দিত্ব কি আরো দীর্ঘায়িত হবে, নাকি সহসা তিনি মুক্তি পাবেন- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। : এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দিনকালকে বলেন, আইনি লড়াইয়ে পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। কারাবন্দির এক বছর উপলে আজ রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। একই দাবিতে আগামীকাল দেশব্যাপী ঢাকা মহানগরী বাদে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হবে। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে দেশব্যাপী মানববন্ধন, দোয়া মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীদের সংগঠন গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়া মুক্তির জন্য জাতীয় প্রেসকাবের সামনে কারামুক্তি বন্ধন ও বাদ জুমা দেশব্যাপী দোয়া মিলাদের কর্মসূচি পালন করবে। : দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে থেকে দলের সিনিয়র নেতারা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুমতি চেয়ে আসছে। সেই অনুমতি এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আজ তার পরিবারের সদস্যরা সাাৎ করতে করাগারে যাবেন বলে জানা গেছে। গৃহবধূ থেকে আপোসহীন নেত্রী হয়ে ওঠা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দুটি ঈদ কারাগারে কাটিয়েছেন স্বজনদের ছাড়া। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুবার্ষিকীও কেটেছে সেখানেই। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঈদের দিনে স্বজনরা কারাগারে দেখা করলেও দুই মৃত্যুবার্ষিকীতে একা একা নামাজ আদায়, দোয়া-দরুদ, কোরআন পড়েই কেটেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিন। ছেলেকে স্মরণ করে অঝোরে কেঁদেছেন কারাগারে। কোকোর প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতে বনানীর কবরস্থানে গিয়ে তার কবর ছুঁয়ে চোখের পানি ফেলতেন। এবারই তার ব্যতিক্রম হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থেকেও তার মনোবল এতটুকুও টলেনি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। কিন্তু শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুচিকিৎসা না পাওয়ায় পুরনো রোগগুলো বেড়ে গেছে। চোখেও প্রচন্ড ব্যথা, তাঁর পা ফুলে গেছে। একা একা হাঁটতে পারছেন না। এই অবস্থা থেকেও তিনি তাঁর দল ও দেশবাসীকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলেছেন। : পরিবার, চিকিৎসক ও দলের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়া চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। কর্তৃপরে অবহেলা, হয়রানি, অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতসেঁতে বদ্ধ পরিবেশের মধ্যে তাঁকে দিনযাপন করতে হচ্ছে, যা একটি চরম নির্যাতন। এই নির্যাতন সহ্য করতে গিয়ে তাঁর পূর্বের অসুস্থতা এখন আরও গুরুতর রূপ ধারণ করেছে। কর্তৃপ তাঁকে সুচিকিৎসা হতে বঞ্চিত করেছে। তাঁকে বিশেষায়িত হাসপাতালের সুবিধা ও ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীা থেকেও বঞ্চিত করেছে কর্তৃপ। : বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসকরা জানান, তাঁর আর্থারাইটিসের ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, হাত নড়াচড়া করতে পারেন না। রিস্ট জয়েন্ট ফুলে গেছে, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলোসিসের জন্য কাঁধে প্রচন্ড ব্যথা, এই ব্যথা হাত পর্যন্ত রেডিয়েট করে। হিপ-জয়েন্টেও ব্যথার মাত্রা প্রচন্ড। ফলে শরীর অনেক অসুস্থ, তিনি পা তুলে ঠিক মতো হাঁটতেও পারেন না। : বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন দিনকালকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তাঁর মতো একজন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা না দিয়ে একটি নির্জন ক,ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যেভাবে রাখা হয়েছে তাতে আমরা সত্যিই ভীষণ উদ্বিগ্ন। কারণ তিনি কারাবন্দি হওয়ার আগেই নানাবিধ অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন। যা তাকে কারাগারে দেয়া হচ্ছে না। যদিও কারাবাসের এই এক বছরে শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ থাকায় গত অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীনও ছিলেন। এখনো অসুস্থ থাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। : এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকেই তার মুক্তির দাবিতে দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি চলছে আইনি লড়াইও। যদিও দলটির আইনজীবী ও নেতারা বলছেন বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি লড়াইয়ে মুক্ত করা যাবে না। কারণ তাকে কোনো অপরাধের কারণে কারাবন্দি করা হয়নি। বন্দি করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। দলের সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতারাও এখন বলছেন, এ সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত হতে দেবে না। তাকে মুক্ত করতে রাজপথে নামতে হবে। তাদের ভাষায়, যেহেতু রাজনৈতিক কারণে তিনি জেলে আছেন, তাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবেই মুক্ত করতে হবে। : বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি লড়াইয়ে মুক্ত করা যাবে না। তাঁকে মুক্ত করতে হলে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন ছাড়া তাকে মুক্ত করা যাবে না। কারণ সরকার ইচ্ছা করে তাঁকে একের পর এক মামলা দিয়ে কারাবাস দীর্ঘায়িত করছে। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। যে নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস পরাজয় হয়েছে। এই দলের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এরপর থেকেই দলের নেতাকর্মীরা হতাশাগ্রস্ত হলেও তারা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত দলের প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারাগারে নেয়ার পর খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। বিভিন্ন সময় বিএনপির প থেকে দাবি করা হয়েছে পরিত্যক্ত কারাগারের স্যাঁতসেঁতে একটি কে একা ৭৩ বছর বয়সী একজন বয়স্ক মহিলাকে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। : বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। এটা দেশবাসী সবাই জানে। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তিনি আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি লড়াই যেমন চলবে, তেমনি সাংগঠনিক কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে। : গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতিহিংসা পূরণের সাজা দেয়ার এক বছর পূর্ণ হলো। চরম অবিচার আর অন্যায়ের আঘাতে দেশনেত্রীকে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে; এক ব্যক্তির অত্যুগ্র মতার ক্ষুধা চরিতার্থ করতেই গণতন্ত্রকে চূড়ান্তভাবে কবরস্ত করার জন্য তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এটি জাতীয়তাবাদী নেত্রীর বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি শক্তির নিষ্ঠুর প্রতিশোধের খেলা, এটি প্রতিহিংসার সাজা। এর আগে গত বুধবার একইস্থানে সংবাদ সম্মেলনে সরকার প্রভাব খাটিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি আটকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান রিজভী। : সরকার প্রধানের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের আহ্বান- এবার একটু ান্ত দিন। অনেক করেছেন, অনেক অন্যায় করেছেন। অনেক অবিচারের মধ্যে আপনি একজন রাজনৈতিক প্রতিপকে নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন করেছেন। এবার একটু ান্ত দিন। একজন গুরুতর অসুস্থ বয়স্কা নেত্রীর ওপর আর জুলুম করবেন না, একটি বছর তাঁকে কারারুদ্ধ রেখে অনেক অত্যাচার করছেন। এবার মুক্তি দিন। আমরা বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাই। : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতার কোনো মামলায় গ্রেফতার নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে কারণেই সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তাঁকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। : তিনি আরো বলেন, যে পর্যন্ত রাজপথ উত্তপ্ত না হবে ততদিন পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ায় জেল থেকে বের করা যাবে না। তাই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামতে হবে। : এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং জামিন না পাওয়ায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীরা বলেন, বিএনপি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হলেও দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি একটি আদর্শ-দর্শন একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি হাসলে আলোকিত হয় হাজারো মুখ; মুখ ফেরালে লাখো মানুষের জীবনে নামে গভীর অন্ধকার। কর্মময় জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বিমূর্ত প্রতীক। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৯ বছর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দেশবাসীর কাছে তিনি ‘আপোসহীন নেত্রী’র খেতাব অর্জন করেছেন। জনগণের ভোটে তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কোটি কোটি অনুসারী সারাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে। মা, মাটি ও মানুষের এই নেত্রী দেশের নারীদের কাছে ‘আইডল’। দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা তাঁকে নিয়ে আগামীর স্বপ্ন বোনেন। নতুন প্রজন্ম দেখেন জেগে ওঠার স্বপ্ন। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারী। শিশু, যুবক, বয়স্ক, বৃদ্ধা সব স্তরের মানুষ বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল; তাঁকে চেনেন, জানেন, মানেন। : বেগম খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে তার আইনজীবীরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৪টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের গত দশ বছরে ৩২টি মামলা দায়ের হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এরমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ৫টি, নাশকতার ১৬টি, মানহানির ৪টি, ৩টি হত্যা, মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার ২টি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, জন্মদিন পালনের একটি, সাবেক নৌমন্ত্রীর ওপর বোমা হামলার একটি, জাতীয় পতাকার অবমাননার একটি, ড্যান্ডি ডাইংয়ের অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন একটি এবং বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের মালিকানা নিয়ে একটি দেওয়ানী মামলা রয়েছে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতের পাঁচ বছরের সাজা দেন আদালত। এই সাজা স্থগিত চেয়ে আপিল করেন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। একইসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করার আবেদন করে দুদক ও রাষ্ট্রপ। এরপর উভয় পরে শুনানি শেষে গত ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের রায় দেন। গত ২৮ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। এখন এ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করতে হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করে দুদক। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় গত ২৯ অক্টোবর বিচারিক আদালতের সাত বছরের কারাদন্ড ঘোষণার পর ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে সাজার বিরুদ্ধে। এই মামলাতেও জামিন আবেদন করতে হবে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় অবৈধভাবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি করে দুদক। : ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে মোট পাঁচবার গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেফতার হন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ হন বিএনপি চেয়ারপারসন। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। সর্বশেষ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এদিকে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলার ২৩টি সংসদীয় আসন থেকে ভোট করে সব কটিতেই জয়লাভ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

  •  
  •  

Leave a Reply