ভোটের মাঠে বঙ্গবন্ধু পরিবারের আট প্রার্থী, নেই জিয়া-খালেদা পরিবারের কেউ

রাজনীতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সারা দেশের বিভিন্ন আসন থেকে ভোটে লড়ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের আটজন প্রার্থী।

অন্যদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান কারারুদ্ধ চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের কেউ প্রার্থী হতে পারেননি এই নির্বাচনে। দলীয় মনোনয়ন পেলেও যাচাই-বাছাই পর্বে বাদ পড়েছেন তারা।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে ও স্বজনসহ মোট আটজন। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর অন্যরা একটি করে আসনে লড়ছেন।

ভোটে বঙ্গবন্ধুর সাত স্বজনের মধ্যে আছেন তাঁর দুই ভাগনে, দুই ভাইপো ও তিন নাতি। ভোটের মাঠে এই আটজনের মধ্যে দুজন এবারই প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন। অন্যরা সবাই বর্তমান সংসদের নির্বাচিত সদস্য।

মেয়ে শেখ হাসিনা লড়ছেন গোপালগঞ্জ-৩ ও রংপুর-৬ আসন থেকে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনে শেখ হাসিনা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়ে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর বোনের ছেলে শেখ ফজলুল করিম সেলিম গোপালগঞ্জ-২ আসনে, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১ আসনে লড়ছেন।

বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরের দুই ছেলে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন। এর মধ্যে শেখ হেলাল উদ্দিন বাগেরহাট-১ আসনে এবং শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল খুলনা-২ আসনে ভোটে লড়বেন। জুয়েল এবারই প্রথমবারের মতো ভোট করছেন।

ভোটের মাঠে আছেন বঙ্গবন্ধুর তিন নাতিও। তাঁরা হলেন বঙ্গবন্ধুর ভাইপো শেখ হেলালের ছেলে শেখ সারহাম নাসের তন্ময় (বাগেরহাট-২), ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে নুর তাপস (ঢাকা-১০) এবং ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন (মাদারীপুর-১) আসনে নির্বাচন করছেন। এই তিনজনের মধ্যে তন্ময় এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন।

ফরিদপুর-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বঙ্গবন্ধুর নাতি নিক্সন চৌধুরী। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি এর আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান সংসদের সাংসদ তিনি। এবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাহর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়বেন। বঙ্গবন্ধুর বড় বোন ফাতেমা বেগম নিক্সন চৌধুরীর দাদি।

অন্যদিকে, প্রায় এক যুগ রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে বিএনপি। ১০ বছর পর এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে দলটি। এবারের নির্বাচনে দলটি অংশ নিলেও দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও বর্তমান চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া পরিবারের কেউ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই। মামলা, কারাদণ্ড ও পলাতক থাকার সমস্যার কারণে এবার জিয়া পরিবারহীন নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো ভোটে অংশ নেয় বিএনপি। ওই নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তাঁর ভাই সাঈদ ইস্কান্দার ভোটে অংশ নেন। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে খালেদা জিয়া ভোটে অংশ নিয়ে একাধিক আসনে জয়লাভ করেন। ভোটে প্রার্থী না হলেও বিভিন্ন সময় খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যরা ভোটে মাঠে ছিলেন। ২০০১–এর নির্বাচনে দলটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন পরিচালনায় সরাসরি ভূমিকায় ছিলেন।

বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। তিনি এখন যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। ভোটের আগে তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর মধ্যেই তিনি তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় সাজা বহাল থাকার কারণে তাঁর দেশে না ফেরার বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত।

তারেক রহমানের সহধর্মিণী জোবায়দা রহমানও বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিনিও তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট সমর্পণ করেছেন, এ কারণে তিনিও দেশে ফিরছেন না বলে বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। যদিও জোবায়দা রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভেতরে বিভিন্ন গুঞ্জন চলছে, কিন্তু পাসপোর্ট না থাকার কারণে সে আশাটা কিছুটা ফিকে হয়ে আছে।

খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান। শর্মিলা তাঁর দুই মেয়ে নিয়ে বিদেশেই থাকেন। মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যেই তাঁর বাস। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়। ওই দিন শর্মিলা রহমান তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। এবারের নির্বাচনে শর্মিলা রহমান কোনো আসন থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করেননি।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ফেনী থেকে খালেদা জিয়ার প্রয়াত ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন ইস্কান্দারের নির্বাচন করার কথা ছিল। শেষ সময়ে তিনিও নির্বাচনে অংশ নেননি। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কাদারও ভোট করছেন না। অবশ্য তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ও নন।

নীলফামারী-১ আসন থেকে এবার ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি খালেদা জিয়ার ছোট বোন সেলিনা ইসলাম বিউটির স্বামী। আজ রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ বলে ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ ছাড়া রফিকুল ইসলামের ছেলে শাহরিন ইসলাম বর্তমানে পলাতক। খালেদা জিয়ার প্রয়াত বড় বোন খুরশিদ জাহান চকলেটের ছেলে শাহরিয়ার রহমান বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় নন।

গত বছরের ২৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের ছোট ভাই আহমেদ কামাল মারা যান। জিয়াউর রহমানের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আহমেদ কামাল ছিলেন সবার ছোট। ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই শুধু জীবিত ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিয়াউর রহমানের পরিবারের কোনো সদস্য এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না।

বরাবরের মতো এবারের নির্বাচনেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। মোট ২৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৭৮ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।

বিএনপি থেকে সাড়ে ছয়শ’র বেশি প্রার্থী ধানের শীষের প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। এর মধ্যে ১৪১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় বৈধ প্রার্থী রয়েছে ৫৫৫ জন। তবে আপিল শুনানীর পর বিএনপির বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা হয়ত আরও বাড়তে পারে। দল ও ঐক্যফ্রন্টের চূড়ান্ত মনোনয়নের ঘোষণা আসলে এদের মধ্যে অনেকেইে আবার তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিবেন জানা যায়।

Leave a Reply