মার্কিন হিজাবী শিশু বিশেষজ্ঞের ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ জয়ের মর্মস্পর্শী কাহিনী

লাইফস্টাইল

সায়মা খন্দকার: স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা নেয়ার পর থেকে পরিবারের সামনে আমি আমার চুলহীন মাথা ঢেকে রাখতাম এবং আমার অসুখ সম্পর্কে তাদের সাথে কষ্টদায়ক আলাপচারিতায় লিপ্ত হতাম না।

ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরুর পর থেকে আমার চুলগুলো ধীরে ধীরে উঠে যেতে শুরু করল এবং একসময় আমি নাপিতের কাছে গিয়ে আমার পুরো মাথা মুণ্ডন করিয়ে নিই। সে সময় আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, আমার কুঁচকানো চুলগুলো আমার চোখের সম্মুখে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিল।

একজন মুসলিম নারী হিসেবে সবসময় জনসম্মুখে চুল ঢেকে রাখতাম। প্রতিদিন সকালে আমি আমার চুলের পরিচর্যা করতাম এবং তাতে হিজাব পরিধান করে নিতাম।

আমি মাথা মুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার ৩৬তম জন্মদিনের পূর্বে। সে সময় আমার স্তন ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। আর তা ছিল তৃতীয়তম অবস্থানে যার মানে আমার ক্যান্সার ওই সময়ে একেবারে নিয়ন্ত্রণ-হীন হয়ে পড়েছিল।

এর পরে আমি কেমোথেরাপি নিতে থাকি। আর এর কিছু দিনের মধ্যেই আমার চুল ঝরে যেতে থাকে এবং গোসল করতে গেলে তা আমি খুব বেশি করে টের পেতাম।

অনেক উৎসাহ সত্ত্বেও আমি আমার চুল মুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু যখন আমার দুই কন্যা কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার মাথার দিকে তাকাত, তখন আমি তাদের বলতাম যে, আমি নতুন ধরনের চুলের স্টাইল করেছি এবং কিছু দিনের মধ্যেই আবার আমার চুল গজাতে শুরু করবে।

একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি জানি যে, আমার সন্তানদের সামনে আমার অসুখ সম্পর্কে লুকনো আমার সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।

কিন্তু আমার ৪বছর বয়সী মেয়ে আমিরার ঠিকই মনে রয়েছে কিভাবে তার নানী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন। একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে আমি সব কিছু খুলে খুলে আমার সন্তানদের তা বলেছিলাম। কিন্তু আমি আমার নিজের অসুখ সম্পর্কে তাদের সামনে কোনো আলোচনা করতে পারছিলাম না।

সুতরাং যখন আমি কেমোথেরাপি নেয়া বন্ধ করে দিলাম তখন ধীরে ধীরে আমার চুল গজাতে শুরু করে দিল। এর পর থেকে আমি আমার সন্তানদের আমার অসুখ সম্পর্কে কিছু বলি নি। তবে তাদেরকে মিথ্যা কথা বলে আমি নিজেকে খুব বোকা ভাবতাম। আমি যদি তাদেরকে আমার অসুখের কথা বলতাম, তখন একটি প্রশ্নের উদয় হত যে- আমি কি তাদের নানীর মত তাদেরকে এক ফেলে রেখে মারা যাব?

যখন শীত আসতে শুরু করে আবার আমি কেমোথেরাপি নিতে শুরু করেছিলাম। আর তখন থেকে ধীরে ধীরে আবার আমার চুল পড়া শুরু হয়েছিল।

যদিও পরিবারের সদস্যদের সামনে হিজাব পরিধান করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবুও আমি আমার মুড়ানো মাথা ঢেকে রাখতে ঘরে হিজাব পরিধান করা শুরু করে দেই।

একদিন আমার বড় মেয়ে আমাকে বলেছিল, ‘মা, তোমার চুল খুবই ছোট’, এর পর সে বলে- ‘তুমি বলেছিলে এগুলো খুব তাড়াতাড়ি গজাতে শুরু করবে।’ আমি জানি একসময় আমি তাকে চুল গজানো সম্পর্কে যা বলেছিলাম তা সে মনে রেখে দিয়েছে।

যখন আমার ছোট ভাই এবং বোন আমার বাসায় আসতো, আমি তখন আমার হিজাবকে আরো বেশী শক্ত করে মাথার সাথে জড়িয়ে রাখতাম এই ভয়ে যে, যদি তারা আমার চুল দেখতে পায় তবে হয়ত কষ্টকর অতীতের স্মৃতি সম্পর্কে তাদের মনে পড়ে যাবে।

আমাকে দেখতে কী রকম দেখায় তা সম্পর্কে আমি সচেতন হয়ে পড়ি। ঘুমানোর সময় আমি হিজাবের বদলে মাথায় একধরনের টুপি পরিধান করতাম। আমার স্বামী ভদ্রতার সহিত আমাকে বলেন, ‘এগুলো শুধুমাত্র কিছু চুল। আর সত্যিকারভাবে আমরা তোমার চুল নিয়ে অতোটা চিন্তিত নই, এটি তোমাকে আমাদের থেকে দুরে সরিয়ে দিবে না।’

হিজাব পরিধানের মাধ্যমে আমি অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করি যা সকল ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে হয় না। আমি আমার সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাই, সেখানকার অন্যান্য বাচ্চাদের মায়েদের সাথে আনন্দের সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন হই। কিন্তু কেউই আমার অসুখ সম্পর্কে বিব্রতকর প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না।

কেমোথেরাপির শেষের দিককার ডোজগুলো কিছু জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। সেসময় জ্বর নিয়ে আমাকে দুবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেসময় আমার মনে হয়েছিল আমি এমন একটি পাহাড়ে চড়তে শুরু করেছি যার উপরের দিকে কোনো অক্সিজেন নেই।

হাসপাতালে থাকার সময়কার দ্বিতীয় রাতে আমার ছোট বোন আমাকে দেখতে আসে। সে আমাকে আশ্চর্যের সাথে বলে- ‘তুমি হাসপাতালে রয়েছ একথা আমাকে আরো আগে জানানো উচিত ছিল। দয়া করে আমার থেকে কিছু লুকিয়ো না। আমাদের জন্য তোমাকে সাহসী হতে হবে না। আমি ঠিক সবকিছু সামলে নিব।’

আমি খুব ধীরে উত্তর দিয়ে বললাম, ‘আমি তা জানি, আমি শুধু তোমাকে নিরাশ করে দিতে চাই নি কারণ তাতে আমি নিজেও নিরাশ হয়ে যাই।’

আমার মা যখন হাসপাতালে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে মারা গিয়েছিলেন সে সময় আমার ছোট বোন তার কাছে ছিল। আমার মায়ের মৃত্যুতে সে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল এবং এ কারণেই আমি তাকে আমার অসুখ সম্পর্কে বলতে ভয় পাচ্ছিলাম।

আমাদের মা যে হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন ঠিক সে হাসপাতালে শুয়ে আমি আমার বোনকে আমার অসুখ সম্পর্কে জানালে তার কি প্রতিক্রিয়া হবে আমি তা টের পাচ্ছিলাম।

আমি আমার লাল হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে আমার বোনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হিজাব খুলে ফেলা কি ঠিক হবে?’

‘হুম.. সে দ্বিধা ধন্ধ নিয়ে বলল, হ্যাঁ অবশ্যই ঠিক হবে।’

আমি গভীর শ্বাস নিলাম এবং হিজাব খুলে ফেললাম।

‘ওহ!, সে অবাক হয়ে বলল- তুমি দেখতে খুব সুন্দর হয়ে গেছ!’ আমি তার কথা শুনে হেসে দিলাম। হাসপাতালে থাকার জটিলতা সম্পর্কে আমি তাকে জানালাম। এমনকি অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেও ডাক্তার বুঝতে পারলেন না কেন আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আমি পরিবারের সদস্যদের সামনে হিজাব পরিধান করা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশ্চার্যান্বিতভাবে আমার মেয়ে আগের মত প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে শুধু বলল- ‘মা, তোমার চুল গজাতে শুরু করেছে।’

কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যখন আমার কেমোথেরাপি চিকিৎসা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখন আমি আমার মাথায় ধীরে ধীরে সুন্দর চুল গজাতে শুরু করেছিল। এর পর থেকে আমি যখন আয়নার সামনে দিয়ে যেতাম আর থমকে দাঁড়াতাম না। আমি আবার আমাকে নতুন করে দেখতে পেয়েছিলাম।

এটি ছিল আমার একেবারে ভিন্ন একটি সংস্করণ- যে কিনা সাহসী এবং সুন্দর। আমি সেই যে কিনা তার অসুখ সম্পর্কে অনির্দিষ্ট পীড়াদায়ক যন্ত্রণায় ভুগেছিল এবং এখন তাকে আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। আমি সেই নারী, যাকে আমি পছন্দ করি এবং পূর্ব থেকেই জানতাম।

সূত্রঃ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে বসবাসকারী সায়মা খন্দকার নামের হিজাবী শিশু বিশেষজ্ঞের কলাম থেকে।

Leave a Reply