তবু সবাই ফিরছে বাড়ি

জাতীয়

পদে পদে দুর্ভোগ। আগাম টিকিট কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাাঁড়িয়ে অধীর অপেক্ষা থেকে শুরু। এরপর কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া; প্রিয়জনদের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটার ঝক্কি পোহানো; নির্দিষ্ট দিনক্ষণে বাড়তি ভাড়া গুণে স্টেশন বা টার্মিনালে পৌঁছানো, শিডিউল ল-ভ- হওয়াতে যাত্রার সময় পিছিয়ে যাওয়া; ফের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাক্সিক্ষত যান পাওয়া, তাতে নিজেদের আসন বুঝে নিয়ে বসা ইত্যাদি। এর পরও রয়েছে যন্ত্রণা। রাজধানীর যানজট ঠেলে এগিয়ে যাওয়া, পথে নানারকম ঝক্কি-ঝামেলা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছাড়াও রয়েছে কত কত বিড়ম্বনা। কিন্তু এত যন্ত্রণা, এত ভোগান্তি মেনে নিয়েও ছুটছে মানুষ। ছুটছে নাড়ির টানে, বাড়ির পানে। প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেলে ভুলে যাবে পথের তাবৎ ক্লান্তি, ভোগান্তি। ঈদ বলে কথা! তাই ছুটছে মানুষ।

আগামীকাল ঈদুল আজহা। রাজধানীর পথ চলতি মানুষের মধ্যে এখন দুটি ধারাÑ এর মধ্যে বড় ধারাটি স্টেশন-টার্মিনালমুখী; অন্য ধারাটি পশুর হাটমুখী। গতকাল সোমবার ছিল ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস। কর্মস্থলে হাজিরা দিয়েই অনেকে বেরিয়ে পড়েন বাড়ি ফেরার তাগিদে।

গতকাল নগরীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং বিভিন্ন বাস কাউন্টারে বাড়িমুখো মানুষের ভিড় ছিল অত্যধিক। রোজার ঈদের তুলনায় এবার ঢাকা ছেড়ে যাওয়া লোকজনের সংখ্যা বেশি। বাস টার্মিনালগুলোয় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা। বাস আসা মাত্রই ছুটাছুটি। বাসের সিট তো বটেই, দাঁড়িয়ে এমনকি ছাদের ওপর বসেও রওনা হচ্ছেন অনেকে। যাপিত জীবনে নগরবাসী হলেও মানুষগুলোর মন আনচান করে বাড়ির টানে। উৎসব-পার্বণে তাই আপনজনের সান্নিধ্য-কাতরতা পেয়ে বসে তাদের। সায়দাবাদ, মহাখালী, গাবতলী সর্বত্র বাড়ি ফেরা মানুষের তাড়া। কাউন্টারগুলোয় অপেক্ষা করতে মন চাইছে না যাত্রীদের। পদ্মার দুই ঘাট শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ার কারণে দুই ঘাটে শত শত গাড়ির জট। ফলে অনেক গাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কমলাপুর রেলস্টেশন মানুষের পদভারে মুখরিত। যদিও সময়মতো ট্রেন ছাড়ছে না। ট্রেন দেরিতে ছাড়ায় অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। কোনোভাবেই শিডিউল নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোর। এ পথের ১১টি ট্রেন নিয়েই যত বিপত্তি।

স্টেশনে পৌঁছতে যানজটে পড়ার ভয়ে মিরপুর থেকে ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই কমলাপুরে পৌঁছেছেন মো. সালেহীন, সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান। যাবেন রংপুর। প্ল্যাটফরমের একপাশে মেঝেতেই কাগজ বিছিয়ে বসে পড়েছেন তারা। সালেহীন বলেন, সকাল ৯টায় রংপুর এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা ছিল। এখন সাড়ে ১১টা বাজে, ট্রেনের খবর নাই। শিডিউল অনুযায়ী, রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় এবং লালমনি ঈদ স্পেশাল ট্রেন সোয়া ৯টায় ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু রংপুর এক্সপ্রেস বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্ল্যাটফর্মে আসে; ছেড়ে যায় বেলা একটার দিকে। আর লালমনিরহাট ঈদ স্পেশাল ঢাকা ছাড়ে বেলা পৌনে ৩টায়। রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা সকাল ৬টায়। প্রায় তিন ঘণ্টা দেরি করে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কমলাপুরে পৌঁছানো পর বেলা সোয়া ৯টায় যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি কমলাপুর ছাড়ে। এছাড়া সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটের পরিবর্তে বেলা সাড়ে ৮টায়; দেওয়ানগঞ্জ ঈদ স্পেশাল পৌনে ৯টায় জায়গায় সোয়া ৯টায়; চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৮টার জায়গায় চার ঘণ্টা দেরি করে বেলা ১২টায় ঢাকা ছাড়ে। দেওয়ানগঞ্জের তিস্তা এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৭টার পরিবর্তে ছেড়ে যায় সাড়ে ৯টায়। অবশ্য দিনাজপুরের একতা বেলা ১০টার বদলে রওনা হয়েছে ১০টা ১০ মিনিটে।

কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, শনিবারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রেনের দেরি হয়। এর রেশ এখনো কাটেনি। তাছাড়া অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ট্রেন চালাতে হয় খানিকটা ধীরগতিতে।

এদিকে সদরঘাটে গতকাল দুপুর থেকেই অস্বাভাবিক ভিড় ছিল। শেষ মুহূর্তে বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ গড়ায় সদরঘাটস্থ এক নম্বর টার্মিনাল ভবনের পূর্বদিকে লালকুঠি ও শ্যামবাজার পর্যন্ত পন্টুন এলাকা এবং পার্কিং ইয়ার্ড পর্যন্ত। ইংলিশ রোড থেকেই পায়ে হেঁটে মানুষ সদরঘাটে যেতে বাধ্য হন। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়কে তীব্র যানজট থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের।

যাত্রীচাপে নির্ধারিত সময়ের আগেই পন্টুন ত্যাগ করতে হয় লঞ্চগুলোকে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা কাজে আসছে না। লঞ্চ বোঝাই করেই চলছে যাত্রী পরিবহন। ছাদেও জায়গা নেই। সাধারণ সময়ে ৬০-৭০টি লঞ্চ চলাচল করলেও সোমবার প্রায় দেড় শতাধিক লঞ্চ টার্মিনালে ছিল। প্রত্যেক লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। এমনকি আইন অমান্য করে লঞ্চের ছাদেও যাত্রী তোলা হয়। ঢাকা সদরঘাট টার্মিনালে লঞ্চে যাতায়াতের সুবিধার্থে ২০টি পন্টুন রয়েছে। গতকাল অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের আমতলী, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ সাতটি রুটে নৌযান সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক যাত্রী নৌযান না পেয়ে পরিবার-পরিজনসহ লঞ্চের পন্টুনে অপেক্ষায় রয়েছেন।

বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক আবু জাফর হাওলাদার বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধ করতে বিআইডব্লিউটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। যাত্রী পূর্ণ হওয়া মাত্র লঞ্চ ছাড়তে হচ্ছে।

Leave a Reply