আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা

জাতীয়

আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহা। দুনিয়ার মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশেও সর্বোচ্চ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, যথাযোগ্য মর্যাদা, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ত্যাগের মহিমায় কোরবানির ঈদ উৎসব পালিত হবে। ঈদের দিন রাজধানীসহ দেশের সকল মুসলমান বিনম্র হৃদয়ে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করবেন এবং নামাজ শেষে মহান আল্লাহর উদ্দেশে পশু কোরবানি দিবেন। : বাংলাদেশের আকাশে গত রবিবার সন্ধ্যায় জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে। কক্সবাজার থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ জানান ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক। হিজরি জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ঈদুল আজহা পালন করেন। বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে রবিবার জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। ২২ আগস্ট বুধবার দেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে। এবার ঈদে ২১, ২২ ও ২৩ আগস্ট সরকারি ছুটি থাকবে। এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আজ মঙ্গলবার ২১ আগস্ট ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। : উল্লেখ্য, আল্লাহর রাহে নিজের জান-মাল ও প্রিয়তম জিনিস সন্তুষ্টচিত্তে বিলিয়ে দেয়ার এক সুমহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে ফিরে আসে। ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী কোরবানি করা ওয়াজিব। আল কোরআনের সূরা কাউসারে বলা হয়েছে, ‘অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড় এবং কোরবানি কর।’ সূরা হজে বলা হয়েছে, ‘কোরবানি করার পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।’ কোরবানির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল সর্বপ্রথম কোরবানি করেন। এ প্রসঙ্গে সূরা মায়েদায় ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, ‘আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পড়ে শোনান। যখন তারা উভয়েই কিছু কোরবানি করেছিল তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল হয়েছিল এবং অপরজনেরটি হয়নি।’ কোরবানি মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাহ। আল্লাহ তার কুদরতী পরিকল্পনায় ইব্রাহীম (আঃ)কে তাঁর শেষ বয়সে প্রিয়তম পুত্র ইসমাইল (আঃ)কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ৮৫ বছর বয়সে হযরত ইসমাইল (আঃ) কে পান। এ অবস্থায় ছেলেকে কোরবানি দেয়া এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু তিনি তাঁর মহান রবের হুকুমে নত হলেন। নিষ্পাপ পুত্র ইসমাইল (আঃ)ও নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। একপর্যায়ে পিতা তাঁর পুত্রকে জবাই করতে যখন উদ্যত তখন মহান আল্লাহর কাছে ঈমানের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ। চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনি জবাই করেন। চোখ খুলে দেখেন তাঁর প্রিয় পুত্র অক্ষত রয়েছে আর কোরবানি হয়েছে একটি দুম্বা। আল কোরআনে এই মহিমান্বিত ত্যাগের ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো তখন ইব্রাহীম (আঃ) তাকে বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্ন দেখেছি তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কি? সে বললো, হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইব্রাহীম (আঃ) তাকে জবাই করার জন্য শায়িত করলেন তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু।’ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর অনুপম ত্যাগের অনুসরণে হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ব মুসলমানরা কোরবানি করে আসছে। তারই নিদর্শনস্বরূপ প্রতি বছর হজ পালনকারীরা কোরবানি দিয়ে থাকেন। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোরবানির পূর্বশর্ত আল্লাহ ভীতি ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাক্সক্ষা। হাদীস শরীফে আছে, ‘মানুষের আমলের প্রতিফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সূরা হজে বলা হয়েছে, ‘এগুলোর গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।’ প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিলো না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ) জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যে কোন একদিন কোরবানি করা যায়। গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এ শ্রেণির প্রাণী দ্বারা কোরবানি করা যায়। কোরবানিকৃত পশুর ৩ ভাগের ১ ভাগ গরিব-মিসকিন, একভাগ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। আবার পুরোটাই বিলিয়ে দেয়া যায়। এদিকে ৯ জিলহজ ফজর নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তালবিয়া পাঠ করা ওয়াজিব। তালবিয়াহ হলো, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে ঈদুল আজহার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বাণী : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাণী দিয়েছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বাণীতে তারেক রহমান বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান। রিজভী স্বাক্ষরিত বাণীতে বলা হয়, ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত ঈদুল আজহা প্রতি বছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে। স্বার্থপরতা পরিহার করে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা কোরবানির প্রধান শিক্ষা। হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-ক্রোধকে পরিহার করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হওয়া আমাদের কর্তব্য। কোরবানির যে মূল শিক্ষা তা ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলিত করে মানবকল্যাণে ব্রতী হওয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে হবে। : পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাণীতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানান। তাদের অব্যাহত সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। : তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে ব্রতী হওয়াই কোরবানির মর্মবাণী। কোরবানির সে শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা আমাদের কর্তব্য। স্বার্থচিন্তা পরিহার করে মানবকল্যাণ এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সোহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় আমাদেরকে সচেষ্ট হতে হবে। : তিনি আরও বলেন, দেশে চলছে এখন জুলুমের রাজত্ব। দেশবাসী গণতন্ত্রহারা। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীদের অনেকেই এখন কারাগারে। বারবার অবরুদ্ধ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকারী ‘গণতন্ত্রের মা’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। গণতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য নির্মূল করতে দেশনেত্রীকে বন্দি করা হয়েছে। ঈদুল আজহার মর্মবাণীকে ধারণ করেই আমাদের দুঃশাসনের অবসান করতে হবে। ঈদুল আজহা সকলের জীবনকে করে তুলুক আনন্দময়, মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তিনি এ প্রার্থনা জানান।

Leave a Reply