রাজনৈতিক সঙ্কট অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গভীর : অধ্যাপক আলী রিয়াজ

জাতীয়

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেছেন, অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট বা অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করেছে এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তার আপাতত সাদৃশ্য থাকলেও এবারের সঙ্কট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং আরও গভীর। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে।

শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’ শীর্ষক গণবক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ বক্তৃতার আয়োজন করে।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, যে কোনো দো আঁশলাকে টিকে থাকার জন্যে নির্বাচন, নির্বাহী ও আইন সভা এবং বিচার ব্যবস্থার ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দরকার হয়। শেষ তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র তৈরি হয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

দেশের রাজনীতিতে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উপস্থিতি এবং ক্ষমতার হাত বদলের মধ্য দিয়ে নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে যে ক্ষমতাসীনদের কাজের বৈধতা তৈরি হয় একমাত্র নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়েই, সেই নির্বাচন অবাধ এবং নিরপেক্ষ হল কিনা সেটা আর বিবেচ্য থাকে না।

তিনি বলেন, যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আর সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়। সমাজে অসহিষ্ণুতা, সহিংসতার ব্যাপক বিস্তারের যে সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি এখানেই।

আলী রিয়াজ তার আলোচনায় বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা চিহ্নিত করতে চাইলে আমাদের চারটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। এগুলো হলো- বাংলাদেশে বিরাজমান শাসনের রূপ, বাংলাদেশের সমাজে নতুন শ্রেণীবিন্যাসের প্রতিক্রিয়া, সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব এবং ভারতের ভূমিকা।

বাংলাদেশে বিরাজমান শাসনের রূপ সম্পর্কে তিনি বলেন, এক সময় যে প্রাণবন্ত সিভিল সোসাইটি ছিল, তার চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। গত এক দশকে সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে নির্বাচনকে জবাবদিহির একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

নতুন শ্রেণীবিন্যাস এবং রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, গত কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান প্রবৃদ্ধির সুবিধা কিছু গোষ্ঠী ভোগ করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষেল প্রকৃত মজুরি হ্রাস পাচ্ছে, ছোট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ জমা হচ্ছে এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার এ উন্নয়নের ফলে নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অতীতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতো গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা এবং অংশগ্রহণমূলক সমাজের স্বপ্ন নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে অনুপস্থিত। কারণ তাদের বর্তমান অস্তিত্ব এ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

অধ্যাপক রিয়াজ বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিল কি নিল না, সেটার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ হল- মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে কিনা, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা।

আলোচনা অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো রওনক জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর মারধরের বিষয়টি উল্লেখ করে এমন পরিস্থিতিতে এরকম একটি গণবক্তৃতার আয়োজন করার জন্য রিডিং ক্লাব ও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানান।

রওনক জাহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি নির্ভর হওয়ায় মানুষ নিরাপত্তাহীনতা ও অধিকারহীনতায় ভুগছে। এ সমস্যা প্রতিকারের উপায় অনুসন্ধান জরুরি এবং তা তরুণদেরই করতে হবে।

দেশের প্রধান সমস্যা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অভাব উল্লেখ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান আরো বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি বরং তা ব্যক্তি নির্ভর। ফলে এ সব প্রতিষ্ঠান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply