আমার বাবা, আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ

সিলেট বিভাগ
নিজাম ইউ জায়গীরদার : বাবা শব্দটা খুব আপন একটা শব্দ বোধ হয় সবার কাছে । আমার বাবা, আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ । সবার বাবা হয়তো তাদের কাছে আইডল হিসাবে থাকে। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন আসলেই যেন অনেকটা আর দশজন বাবার চেয়ে ভিন্ন।
বাবার মৃত্যুর ২২ এর অধিক বছর পরও মানুষ যখন আমার শিকড়ের কাছে ফিরে যায়, রাস্তাতে কোন কোন বয়স্ক লোক হঠাত আমাকে ডেকে বলেন এই তুমি জায়গীরদার সাহেবের ছেলে না! আমি নীরবে মাথা সাই দেই হা। লোকটা একটুও না থেমে বলতে থাকেন, তোমার বাবা খুব ভাল মানুষ ছিলেন, এলাকায় এরকম সত মানষ খুব কম আছেন । আমার বুক গর্বে ভরে যায়, এই না হলে আমার বাবা, যিনি তার মৃত্যুর ২২ বছর পরও আজও বেচে আছেন মানুষের মাঝে।
আমার প্রিয় বাবা, বিলাসহীন সাদামাটা জীবন যাপন করে গেছেন সারাটি জীবন । অবাক লাগে যখন ভাবি, প্রচন্ড মিতব্যয়ী একজন মানুষ অথচ শখ পুরনে ছাড় দিবেননা একটুও। প্রচন্ড শৌখিন মানুষ ছিলেন বাবা, সীমিত পোশাকের মধ্যেই একধরনের আভিজাত্য ফুটে উঠতো তার শরীরে । ১৯৭০ এর দশকে যে কজন স্যুট পড়া সভ্য বাঙ্গালী ছিলেন, তার একজন আমার বাবা ।
মাছ ধরার নেশা ছিলো বাবার প্রচন্ড । বিশাল বিশাল ছিপ নিয়ে চলে যেতেন মাছ ধরতে, একবার বিসাল এক মাছ নিয়ে ফিরলেন যেটা তখনকার আমার থেকে সাইজে বড়।
অনেক অনেক ফুল গাছের টব ছিল আমার বাবার, অফিস থেকে ফিরে এক দৌড়ে ছাদে চলে যেতেন গাছ গুলার পরিচর্যা করতে ।
মানুষের জীবনের সেরা বয়স ১৮ । ঐ সময়ের তিন বছর আগেই রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি। রাজনীতি করার কারনে থানা-পুলিশ-মামলা-গ্রেফতার আমার পিছু ছাড়তো না । সবাই আমাকে অন্য চোখে দেখতো, আমাকে উশৃংখল বলতো, কেও কেও সন্ত্রাসীও বলতো, আমি প্রতিবাদ করতাম না, কিন্তু কষ্ট টিকই পেতাম ।
আমার বাবা মাকে বলতেন তোমার ছেলের জন্য মানুষের কথা শুনতে হয়, ওকে বলে দিও ঠিক হয়ে চলতে । বাবাকে আমি ভীষণ ভয় পেতাম ঠিকই, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুলে যেতাম বাবার শাসন। প্রতি সপ্তাহে চাকরীস্থল থেকে এসেই আমার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়ে পারিবারিক আদালত বসতো, সেই আদালতের রায়ে আমার উপর উত্তম মধ্যম হতো। বাবার উত্তম মধ্যম খেয়ে একটুও মন খারাপ হতোনা, কারন আমার বাবা আমাকে কখনো প্রশ্রয় দিতেননা । বাবার শাসনের আড়ালে প্রচণ্ড ভালবাসা ছিল এটাও আমি বুঝতাম।
বাবার চাকরি জীবন এবং আমার ফেরারি জীবনের কারণে বাবার হাত ধরে ঈদের জামায়াতে যাওয়া হয়নি। বাবার অবর্তমানে আমার এই জীবনে যখন ঝড় আসে তখন বুকের ভিতর এক সীমাহীন শূন্যতা অনুভব করি। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। বাবা নেই মাথার উপর কোন ছায়া নেই, মায়া নেই, শাসন নেই । তখন বার বার শুধু বাবার কথাই মনে পড়ে । বাবার মৃত্যুর পর বুঝলাম পিতৃ স্নেহ, পিতার মমতা , আকাশের মতো উদার, সাগরের মতো গভীর। আমার বোনের গায়ে হলুদের দিন সকালে আমার প্রিয় জনক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আমরা ৭ বোন ১ ভাইকে এতিম করে আমার মমতাময়ী মাকে বিধবা করে জান্নাতবাসী হন। আমার বাবা আমার কাছে শুধু ২টি দাবী করেছিলেনঃ (১)তার কাছে আমার বিরুদ্ধে কোন নালিশ যেতে পারবেনা। (২) সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জন করে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে । মানুষের মতো মানুষ না হতে পারি, অমানুষ হই নাই। বাবা শুধু আমাদের দিয়েছেন কিছু নেননি। ৭০ঊর্ধ্ব কাউকে দেখলে বুকের ভিতর হাহাকার করে উঠে। হায়রে, বাবা বেঁচে থাকলে তিনি এমনি বয়সী হতেন।
আজকের বাবা দিবসে, আমার অতি সাধারন হয়েও অসাধারন বাবাকে জানাচ্ছি শুভেচ্ছাপূর্ন কৃতজ্ঞতা। যিনি শুধু সুশীতল ছায়াই নয় বরং আমাকে দিয়েছেন গর্ব করার পূর্ন অধিকার। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা , তুমিই আমার অহংকার , তুমিই আমার পৃথিবী । বাবা দিবসে বাবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি । এবং পৃথিবীর সকল বাবার সুসাস্থ, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছি।
বাবা দিবস অমর হউক………..

Leave a Reply