লন্ডনে বিএন‌পি আ’লী‌গের জু‌তাব‌া‌জি’র রাজনী‌তি

সিলেট বিভাগ

মুনজের আহমদ চৌধুরী : বুধবার লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ঢুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুর করেছে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর আগে এই হাইকমিশনে হামলা হয়েছিল ১৩ বছর পূর্বে। বুধবার শুধু ভাঙচুর করেই থামেনি বিএনপি নেতাকর্মীরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যে মানুষটির হাত ধরে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আমরা পেয়েছি একটা স্বাধীন দেশ- সে নেতার ছবিটি হাইকমিশন ভবনের বাইরে এনে অসম্মান ও অবমাননা করেছে।

আমি বিস্মিত হই, যারা এ কান্ডটি ঘটিয়েছেন তারা কেউ নিরক্ষর নন। তাদের সবার পরিবার আছে। তাদের অনেকে এদেশে বহুবছর ধরে আছেন, সভ্যতা, মানবতা মানবার শপথ নিয়ে নিয়েছেন ব্রিটিশ পাসপোর্ট। এদের কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীও। তারা বাস করেন ব্রিটেনের মতো একটি সভ্য রাষ্ট্রে। বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলার রায়ের আগের দিন ঘটানো হয় এ ঘটনা। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এ ঘটনা ঘটিয়ে বিএনপির মতো একটি দল রাজনৈতিকভাবে কী অজর্ন করলো? যারা জুতো মারার কীর্তিটি করলেন, তারা এ ঘটনার মধ্য দিয়ে কী বার্তা দিতে চাইলেন?

দুই.
বৃহস্পতিবার দুপুরবেলা আগের দিনের বিএনপির এ কুকীর্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ। স্থান সেই বাংলাদেশ হাইকমিশন চত্বরই। সভার আগেই আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা নিয়ে আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বড়ো আকৃতির কিছু ছবি। সভা চলাকালে মিডিয়ার সামনেই নেতাকর্মীরা মহানন্দে জুতোপেটা করতে থাকেন বিএনপির এ তিন নেতার ছবিতে। সেসব উচিত শিক্ষা, আর জুতোর জবাবে জুতো দিয়ে দ্যার্থহীন (!) প্রতিবাদের ছবি আওয়ামীলীগের কিছু নেতা আপলোডও করেন নিজেদের ফেসবুকে। ভিডিওতে দেখলাম, ঐ সভায় আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা নিজেদের বক্তব্যে বলেছেন, ‘তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপি লন্ডন হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছে’।  আমার ভেতরে প্রশ্ন জাগে, জুতো মারামারির প্রতিবাদের ধারায় তারা বঙ্গবন্ধু আর তারেক রহমানকে কোন কাতারে নামালেন বা উঠালেন?

তিন.
বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলে এখানকার বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী লন্ডন সফরে এলে বিক্ষোভের নামে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে জুতো ও ডিম ছুড়ে মারেন। আবার, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে একই কায়দায় কাজটি করতেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এই কাজটিকে আবার দু’দলের নেতাকর্মীরাই বলেন বিক্ষোভ প্রদর্শন আর প্রতিবাদ! আমি যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ আর বিএনপির কয়েক সিনিয়র নেতাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছি। তাদের উত্তর পরস্পরের প্রতি দোষাদোষীতেই সীমাবদ্ধ। আওয়ামীলীগের নেতারা বলেন, আমরা নই, বিএনপি যুক্তরাজ্যে জুতো আর ডিম ছোঁড়াছুড়ির রাজনীতি আগে শুরু করেছে। বিএনপি নেতারা বলেন, না আওয়ামীলীগই আগে শুরু করেছে।

ইদানিং, নতুন এক ধরনের ভন্ডামীবাচক নিরপেক্ষতার কথা বলছেন ক্ষমতাশীনরা। সরকারের কোন অন্যায় কাজের সমালোচনা করলেই বলা হয়, বিএনপি তো ক্ষমতায় থাকতে এরচেয়েও খারাপ কাজ করেছে।
এমন উত্তরে আমি ভেবে পাই না, কোন রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী কী করে অতটা নীচতায় ভুলের জাষ্টিফিকেশন করেন।

চার.
বাংলাদেশ হাইকমিশন এদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে, আওয়ামীলীগ বা বিএনপির নয়। মানি, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে দেশে, এখানকার সে দলের নেতাদের কথা হাইকমিশনের কর্তাদের শুনতে হয়। বাংলাদেশেও তো সব সেক্টরে একই বাস্তবতা। ক্ষমতা দল  পাল্টায়, বাস্তবতা ঘুরে-ফিরে একই থাকে।
লন্ডনে বাংলাদেশ দুতাবাসে কিন্তু এবারই প্রথম হামলা নয়। প্রায় তেরো বছর আগে সাবিহ উদ্দীন আহমেদ যখন লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তখন হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছিল তখনকার বাংলাদেশের বিরোধীদল আওয়ামীলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আমি একজন পরবাসী বাংলাদেশী। দেশ ছেড়ে যতদুরে যাই বাংলাদেশকে ঠিক ততখানি হৃদয়ের মমতায় লালন করি অন্তরে। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এখানকার বিএনপি জামাত,আওয়ামীলীগের রাজনীতি আমাকে লজ্জিত করে। রাজনীতির নাম ভাঙ্গিয়ে প্রবাসের বুকে মিডিয়া কাভারেজ পাবার নামে এখানকার বিবিসির প্রধান কার্যালয় তারা ঘেরাও করেন। উদ্দেশ্য, যদি বিবিসির খবরে একটুখানি তাদের ছবি আর নামটা ছাপে। কিন্ত, হায়! বিবিসি কর্তৃপক্ষ উল্টো পুলিশ ডেকে আপদ তাড়ায়। এখানকার বাংলাদেশী রাজনীতিবিদেরা সংবাদ সন্মেলন করে ঘোষনা দেন তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলা করেছেন। এ বিরল কৃতিত্ব (!) দেখিয়ে তারা নিজ দলের নেতার কাছে ক্রেডিট নেন, বাহবা কুড়ান, মিডিয়ায় কাভারেজ পান। সংবাদ সন্মেলনে পরিচয় করিয়ে দেন মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যারিষ্টারকেও।

পরে খোজঁ নিয়ে দেখা যায়, মামলা তো দুরের কথা, কোন অভিযোগই নেই হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালতে এ নামে। জেনেভার আর্ন্তজাতিক আদালতের ওয়েবসাইটে যোগাযোগের জন্য দেয়া ই-মেইলে একটি বারো লাইনের টাইপ করা চিঠি পাঠিয়েই তারা দাবী করেছেন মামলা করার! আর আর্ন্তজাতিক আদালতের প্যানেলভুক্ত আইনজীবি ছাড়া কেউ সে আদালতে মামলা পরিচালনাও করতে পারেন না।

এখানকার বাংলাদেশী রাজনৈতিক দলের এক শ্রেনীর নেতারা নিয়মিতই পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলের অফিসে হাজির হন। ভাই, নিউজ করে দিতে হবে। ‘অমুক…ইস্যুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়ে আসলাম’। পরে খোজঁ নিয়ে দেখা যায়, তারা টেন ডাউনিং ষ্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে কর্মরত পুলিশ কনষ্টেবলের সাথে হাসিমুখে করমর্দন করে দিয়ে এসেছেন স্মারকলিপি। যে কনষ্টেবলের দায়িত্ব আসলে গেটম্যানের।

এদেশে বিএনপি আওয়ামীলীগের কমপক্ষে একডজন সিনিয়ার নেতাকে চিনি, যারা এদেশে নিজেদের নাম পাল্টেছেন একাধিকবার। ব্যাংক থেকে নিজেদের কোম্পানীর নামে লোন নিয়ে কোম্পানী গায়েব করে নিজেদের নামেরও এক দুইটা অক্ষর বা টাইটেল এদিক সেদিক করে বনে গেছেন অন্য  ব্যাক্তি! অনেকের পাসপোর্টের নাম এক, এদেশে রাজনীতি করেন ভিন্ন নামে। অনেকের ভিন্ন ভিন্ন নামে রয়েছে বাংলাদেশী, ব্রিটিশ ও ইউরোপিয়ান পাসপোর্ট। ইন্সুরেন্স, সার্টিফিকেট, জালিয়াতির বহু ঘটনায় এদেশে জেল খেটেছেন এখনো খাটছেন বাংলাদেশী রাজনীতির  বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক (!) পরিচয় দেয়া এসব নেতারা।

থাক, লজ্জার কথা আর না বলি। লজ্জার জবাবে লজ্জা দিয়ে, ঘৃনার জবাবে ঘৃনা দিয়ে কোনদিন সুস্থ রাজনীতির দিন আসবে না। বিকৃতির ধারায় কখনো উন্মেষ হবে না সুদিনের স্বরূপ। কিন্তু, মুশকিল হলো, আমাদের রাজনীতিবিদদের সেটা কে বোঝাবে? রাজনীতির নামে তারা প্রবাসের বুকে আর কত লজ্জিত করবেন আমাদের? আর কতটা কালিমা লেপন করবেন বাংলাদেশী পরিচয়ে?
উত্তর কার কাছে চাইব?
বাংলাদেশের একজন সন্তান হিসেবে আমি লজ্জিত আজ খুব প্রিয় জন্মভূমি, তোমার কাছে। বিদেশের বুকে বাংলাদেশ, তোমার নামটাকে বারে বারে অপমানিত হতে দেখতে হচ্ছে বলে।

লেখক : সাংবাদিক, সদস্য রাইটার্স গীল্ড অব গ্রেট ব্রিটেন

Leave a Reply