জরুরি বৈঠকে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা

রাজনীতি

বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের জরুরি বৈঠক চলছে।

রবিবার বিকেল ৫টার দিকে বৈঠকটি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান।

এর আগে শনিবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, রবিবার বিকাল ৫টায় ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে। বৈঠকে আগামী দিনে জোটের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হবে। বর্তমান পরিস্থিতির সার্বিক পর্যালোচনা হবে।

এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় দলের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে ভাইস-চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম-মহাসচিবদের সাথে বিএনপির স্থায়ী কমিটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি এখন আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ। চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাবে বিএনপি।

এসময় বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল এখন আগের চাইতে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ বলে দাবি করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল বলেন, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান টেলিফোনে বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অনুপ্রেরণামূলক। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুরোনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিত্যক্ত ও স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষে একাকী রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। এমনকি খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত গৃহকর্মী ফাতেমাকেও তার সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়নি। বরং তাকে জেলখানার অন্য একটি কক্ষে থাকতে দেওয়া হয়েছে।

ফখরুল অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়া যে ঘরটিতে আছেন সেটি নড়বড়ে ও ব্রিটিশ আমলে তৈরি হওয়ায় বহু পুরোনো। তিনি অসুস্থ হওয়ার পরেও তাকে ওষুধ দেওয়া হয়নি, তার চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাও করা হয়নি।

বিএনপির চেয়ারপারসনকে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান দলটির এই নেতা। আন্দোলন করতে গিয়ে যারা গ্রেপ্তার বা আহত হয়েছেন তাদের জন্য সহানুভূতি জানান তিনি। সেইসঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেন বিশেষ আদালতের বিচারক ডা. মো. আখতারুজ্জামান। রায়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং দুই কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

রায় ঘোষণার পর পরই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এঁদের মধ্যে তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান পলাতক।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১০ সালের ৫ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে শনিবার সন্ধ্যা ৭ টায় প্রথমবারের মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছেন দলটির নীতি নির্ধারকরা।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে জানান চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবীর খান।

এব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আরটিএনএনকে বলেন, ‘সন্ধ্যায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও যুগ্ম মহাসচিবদের বৈঠক হয়েছে। এতে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন সিনিয়র নেতা বলেন, খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার পর বিরাজমান অবস্থা নিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এর পাশাপাশি আজকের বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল ভবিষ্যতে দলের করণীয় নির্ধারণ। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দেওয়া বক্তব্যে যেন অভিন্নতা থাকে, সে বিষয়ে আজ জোর দেওয়া হয়েছে। বক্তব্য দিয়ে দলের ঐক্যে যেন কোনো ধরনের বিভেদ সৃষ্টি না হয়, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে দলটি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির সূত্রগুলো জানিয়েছে, আজকের বৈঠক ডাকার পেছনে তারেক রহমানের নির্দেশনা ছিল। তবে আজকের বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করছেন সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।

বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কের কারাগারে বন্দি হওয়ার পর দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় এটাই বিএনপি নেতাদের আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠক। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে এসেছেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র।

এর আগে শুক্রবার মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান গুলশানের কার্যালয়ে নিজেদের মধ্যে বৈঠক হয়।

এছাড়াও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়সহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানাতে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ডেকে সংবাদ সম্মেলন করেছে বিএনপি।

দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ ও সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ব্রিফ করে দলটি।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে।

ব্রীফিংকালে মির্জা ফখরুল বলেন, গভীর নীলনকশার এই রায়ের মূল লক্ষ্য বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। বিএনপিকে পর্যদুস্ত করা। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখা সম্ভব না।

তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়কে ঘিরে সারাদেশে বিএনপির সাড়ে ৩ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। সরকার বাধা না দিলে তিনি প্রচলিত আইনেই বেরিয়ে আসবেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ রায় ফরমায়েশী, অবৈধ, বেআইনি, আইনের লঙ্ঘন। তাকে যে ধারায় দণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ধারা নয়। তাই দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করা যায়নি।

ব্রীফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নওশাদ জমির প্রমুখ।

বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন বিবিসির সিনিয়র রিপোর্টার কাদির কল্লোল, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির ব্যুরো চিফ শফিকুল আলম, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির ব্যুরো প্রধান জুলহাস আলম, জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের ব্যুরো চিফ হারুন উর রশীদ ও ভারতীয় গণমাধ্যম জি মিডিয়ার ব্যুরো চিফ রাজীব খান, কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা, মার্কিন গণমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকা ও পাকিস্তানি গণমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিনিধিরা।

আইনি দিকগুলো তুলে ধরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, খালেদা জিয়াকে দণ্ড দেওয়াটা হলো অবৈধ, বেআইনি ও আইনের লঙ্ঘন। দুর্নীতির সঙ্গে খালেদা জিয়ার কোনও সংযোগ নেই। এই মামলার বাকি পাঁচ আসামির ক্ষেত্রে দুর্নীতির সংযোগের কথা বলা হলেও রায়ে খালেদা জিয়ার দুর্নীতির সংযোগের কথা বলা নেই।

তিনি বলেন, সরকারি তহবিলে এতিমদের জন্য কোনও তহবিল নেই। কুয়েত থেকে আসা টাকা লেনদেন করেছেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। টাকা ছাড় করার জন্য তিনি সরকারকে ব্যবহার করেছেন। সেই টাকার কিছুটা খরচ হলেও বাকিটা ব্যাংকে আছে, যা এখন সুদে-মূলে তিনগুণ হয়েছে। ফলে তহবিল তছরুপের কোনও বিষয় এই মামলায় নেই। এই তহবিলে অবৈধ উপায়ে সুবিধা নেওয়া হয়নি।

Leave a Reply