‘বিচারের নামে প্রহসণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জাতির প্রত্যাশা নষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র’

রাজনীতি

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংসের জন্য গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। যেকোনো মূল্যে এই ষড়যন্ত্র রুখতে হবে।

শনিবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে গুলশান কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে জাল-জালিয়াতি করে বিচারের নামে প্রহসণ এবং বিরোধীপক্ষকে দমন করার জন্য আদালতকে ব্যবহার করার একটি নোংরা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ এবং আইনের শাসন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এমন আচরণে দেশের জনগণ আজ ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধ। একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন, যেটা জাতি আশা করছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সকলের অংশগ্রহণে সেটাকে নষ্ট করার ষড়যন্ত্র বলে আমরা মনে করি।’

তিনি আরো বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় রায়কে কেন্দ্র করে পুরো জাতি আজ উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ। আমরা মনে করি, এটা গভীর ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য।

বৈঠক শেষে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এই প্রেস ব্রিফিংয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি শুধু একটি রেজুলেশন আপনাদের সামনে পড়ে শোনাব। গত ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য হঠাৎ সমাপ্ত ঘোষণা করে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়। উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবীদের মতে, এমন ঘটনা শুধু অপ্রত্যাশিত ও অস্বাভাবিক নয়, রহস্যজনক। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জাতীয় নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার জন্য দ্রুত রায় ঘোষণা-তা সেই অপচেষ্টা অংশগুলোই দেশবাসী মনে করে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে গত কয়েকদিন ধরে সরকারের মন্ত্রীগণ এবং বিশেষ দূত (জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) এই মামলার রায় এবং তার পরবর্তী সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে সরকার এবং সরকারি দলের বিভিন্ন প্রস্তুতির কথা যে ভাষায় বলে চলেছেন তাতে প্রমাণিত হয় যে মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকলেও তার রায় কী হবে তা সরকার এবং সরকারি দলের জানা আছে বলেই মনে হয়।’

‘বিএনপির আজকের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে সরকারের আইন ও আদালতের নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধ আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এ ব্যাপারে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিচারের নামে সরকারি ষড়যন্ত্রের নামে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ শেষে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখিত বক্তব্য শেষ করেন মির্জা ফখরুল।

এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ বৈঠক শুরু হয়।

খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত রয়েছেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে দলের নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়েও আওয়ামী লীগ আগের অবস্থানেই রয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের সাথে আলোচনা করে দলের করণীয় নির্ধারণ করতেই মূলত সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির বৈঠক বসেন তিনি।

যেনতেন একটা রায় জনগণ মেনে নেবে না: ফখরুল

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘এতো সোজা নয় দেশনেত্রীকে যেনতেন একটা রায় দেবেন। জনগণ মেনে নেবে না।’ বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্বেচ্ছসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূইয়া জুয়েল ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলীর মুক্তির দাবিতে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রতিবাদ সভায় মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে সরকার ‘অন্যায় আচরণ’ করছেন অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘খালেদা জিয়া উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তিন বারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দুই বারের বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন।’

‘তার সঙ্গে আপনারা যে আচরণ করছেন, পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে তা নজিরবিহীন। আমরা এর নিন্দা জানাই। জাতি এর জন্য কোনো দিন আপনাদের ক্ষমা করবে না।’

সরকার সুপরিকল্পিতভাবে বিচার বিভাগকে ‘করায়ত্ত করেছে’ অভিযোগ করে মির্র্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে যে মামলার রায় দেওয়া হবে সেটি কোনো মামলাই হয় না। তার আইনজীবীরা প্রতিটি অভিযোগ খণ্ডন করেছেন এবং প্রমাণ হয়েছে, এই মামলা কোনো মামলাই হতে পারে না। সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর এই মামলা হয়েছে।’

‘যে ট্রাস্ট্রে খালেদা জিয়ার কোনো সম্পৃক্ততাই নেই, যে ট্রাস্ট্র গঠনে তার কোনো মন্তব্য নেই, কোনো ডকুমেন্টে স্বাক্ষর নেই, কোনো নির্দেশনা নেই। একটা জাল ফাইল-নথি হাজির করা হয়েছে। আমাদের আইনজীবীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, এই নথিটি সম্পূর্ণভাবে জালিয়াতি করে ঘষামাজা করে কোনো স্বাক্ষর ছাড়াই রাষ্ট্রপতির প্যাডে সেই নথি তৈরি করা হয়েছে’, বলেন তিনি।

অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো করে মামলা শেষ করা হয়েছে অভিযোগ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘শেষ দিনে আইনজীবীরা আরো কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে বক্তব্য শেষ করা হয়েছে এবং মামলার রায় তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যিনি (খালেদা জিয়া) ১৬ কোটি মানুষের আশা-ভরসাস্থল তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায় (ক্ষমতাসীনরা)- এটা কি হতে দেবেন?’

তিনি আরো বলেন, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। আসুন জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে সবাই মিলে রুখে দাঁড়াই।

‘কেন এই জোর করা? আইনের স্বাভাবিক যে গতি তা বন্ধ করে দিয়ে দ্রততার সঙ্গে কেন এই রায় দেওয়ার চেষ্টা? কারণ একটাই বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে তা কঠোর হাতে দমনের যে কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার প্রসঙ্গ তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই কথা বলছেন কেন? কারণ রায় তো আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। আপনারা বলছেন ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে রায় হতে যাচ্ছে।’

আয়োজক স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এস এম জিলানীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভুঁইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

Leave a Reply