হাসিনার সঙ্গে ‘ট্র্যাক টু’ আলোচনায় ঢাকায় প্রণব, রোহিঙ্গা শিবিরে যাচ্ছেন না

জাতীয়

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কার্যত গোটা বিশ্ব সফর করেছেন। যদিও শেষ দিকে দিল্লির বাইরে পা বাড়াতে ছিল গভীর অনীহা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরে এই প্রথম বিদেশ সফরে প্রণব মুখোপাধ্যায়।

আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রবিবার থেকে শুরু হওয়া তাঁর চার দিনের বাংলাদেশ সফর ঠাসা কর্মসূচিতে। ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য উৎসবের পৌরহিত্য থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের রাউজানে সূর্য সেনের ভিটে পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথাও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবল উৎসাহ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাচ্ছেন না ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি।

এতে আরো বলা হয়, এটা ঠিকই যে গত চল্লিশ বছরে শাসক দল হোক বা বিরোধী শিবির— বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রচনায় প্রণববাবুর প্রভাব থেকেছে সব চেয়ে বেশি। বর্তমান সফরটিতে তাঁর প্রত্যক্ষ কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই ঠিকই। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশে আসছেন তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে হাসিনার সঙ্গে ‘ট্র্যাক টু’ আলোচনা করতেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের মুখে দাঁড়ানো বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটিও এখন যথেষ্ট স্পর্শকতার জায়গায় দাঁড়িয়ে। তিস্তা চুক্তি এখনও বিশ বাঁও জলে। আওয়ামী লীগ সূত্রের খবর, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থানে হতাশ হাসিনা। প্রণববাবু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবিরে গেলে কিছুটা হলেও সুযোগ ছিল সেই ক্ষত মেরামতির। কিন্তু কূটনৈতিক সূত্রের খবর, মোদী সরকার সেই ঝুঁকি নিতে নারাজ।

এতে আরো বলা হয়, ঢাকার ওয়াকিবহাল শিবির বলছে, প্রণববাবু যদি চট্টগ্রামে না-যেতেন, তা হলে রোহিঙ্গা শিবির যাওয়ার প্রসঙ্গই উঠত না। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির আকাশপথে খুবই কাছে। প্রণববাবুর ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, তিনি নিজেও আগে ভেবেছিলেন শিবিরে যাবেন। ভারত যে শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল সেই বার্তা যাবে। কিন্তু সাউথ ব্লকের বক্তব্য, প্রণববাবু গেলে আরও বেশি প্রশ্ন উঠত। জানতে চাওয়া হতো, ভারত রোহিঙ্গা নিয়ে কী অবস্থান নিচ্ছে। ভারতের মায়ানমার নীতি নিয়েও অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে বিতর্ক বাড়ত। আর তাই সচেতন ভাবেই এই না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চিন ত্রিস্তরীয় সমাধান সূত্র ঘোষণা করার পর নিঃসন্দেহে ভারতকে পিছনে ফেলে বাংলাদেশে বেজিংয়ের প্রভাব বেড়েছে। ৬ লাখ শরণার্থী নিয়ে নাস্তানাবুদ হাসিনা সরকার আশা করেছিল ভারত বিষয়টি নিয়ে মায়ানমারের উপর চাপ দেবে। সক্রিয় দৌত্য করবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে মায়ানমারে গিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণটুকুও করলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বরং সে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে মায়ানমারকে খুশি করার চেষ্টা করলেন। কারণ, ভারতের বরাবরের আশঙ্কা—মায়ানমারকে তুষ্ট না-রাখতে পারলে দেশটি পুরোপুরি চিনের প্রভাবে চলে যাবে।

এতে আরো বলা হয়, পরে অবশ্য বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য ত্রাণ পাঠিয়ে কিছুটা ভারসাম্যের চেষ্টা হয়, কিন্তু তত ক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। চিন ঘোষণা করে দিয়েছে শরণার্থী সমস্যা মেটাতে তারা আর্থিক এবং কূটনৈতিক সব রকম ভাবে শেখ হাসিনার পাশে রয়েছে। প্রয়োজনে মায়ানমারের উপর চাপ তৈরি করেই।

ঢাকার এক কূটনীতিকের কথায়, ‘মায়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সেনা প্রশাসন— দু’তরফেই চিনের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। তারা এগিয়ে আসায় আমরা আশাবাদী যে রোহিঙ্গা সমস্যা মিটবে।’

প্রণব মুখার্জি ঢাকায় আসছেন বিকেলে
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি চার দিনের ব্যক্তিগত সফরে ঢাকায় আসছেন আজ রবিবার বিকালে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশে আসছেন তিনি।

প্রণবকে বহনকারী জেট এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিকাল ৪টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।

ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ সফরকালে প্রণব মুখার্জি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেবেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বৈঠক করার কথাও রয়েছে।

প্রণব মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে তাকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম সফরকালে শহীদ সূর্য সেনের বাড়ি পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

এছাড়া তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সম্মান জানাতে ধানমন্ডি-৩২ এ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন।

আগামী ১৮ জানুয়ারি তার ঢাকা ত্যাগ করার কথা। ভারতের ১৩তম প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি গত বছর জুলাইয়ে অবসরে যান।

ভারতীয় এই বাঙালি রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের মাঝে দীর্ঘ দিনের উষ্ন সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতর্ফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের সমর্থনে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে খবরে প্রকাশ।

রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালে প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন এবং তার শ্বশুরবাড়িও যান।। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভারত সফরে গিয়ে বিশেষ অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান করেছিলেন।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জী ১৯৪৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নড়াইল সদর উপজেলার চিত্রাপাড়ের ভদ্রবিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মা মীরা রানী ঘোষ আর বাবা অমরেন্দ্র ঘোষের আদরের মেয়ে ছিলেন প্রণব পত্নী শুভ্রা ঘোষ।

প্রণব মুখার্জীর সাথে প্রণয়ের পর ‘শুভ্রা মুখার্জী’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি (শুভ্রা)। শুভ্রা মুখার্জী পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। গত বছরের ১৮ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লির একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার শেষকৃত্যে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যান শেখ হাসিনা।

শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পরে ভারতে আত্মগোপন করে ছিলেন শেখ হাসিনা। তখন দীর্ঘদিন প্রণববাবুর বাড়িতেই ছিলেন তিনি। শুভ্রাদেবীর সঙ্গে তখনই হাসিনার বড় বোন-ছোট বোনের সম্পর্ক তৈরি হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তার কন্যা শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান। এসময় তার ছেলেমেয়েরা খালার মতোই দেখতেন শুভ্রাদেবীকে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

Leave a Reply