৯০-র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গণআন্দোলন দরকার

রাজনীতি

আলী মামুদ : গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকার তথা সংবিধান অনুযায়ী চলাফেরা, মত প্রকাশসহ অন্যান্য অধিকার আদায়ের দাবিতে সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল হিসেবে ’৯০-এর স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল। সেই স্বৈরাচারের সাথে হাত মিলিয়ে বর্তমান সরকারের নবতর স্বৈরাচার নতুন করে যে কালো-অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে তার অবসানে নতুন করে গণআন্দোলনের তাগিদ দেযা হয়েছে। ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বরের বার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ’৯০-এর ছাত্রআন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই তাগিদ দিয়েছেন। গতকাল দৈনিক দিনকালের সাথে পৃথক পৃথক সাক্ষাৎকারে তারা বলেন, ’৯০-এ এই দেশের ছাত্র-যুব-জনতা যে ঐক্যবদ্ধ গণজাগরণের সৃষ্টি করেছে, সেই চেতনায় নতুন করে গণচেতনার সময় এসেছে। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আমানুল্লাহ আমান ও জিএস খায়রুল কবির খোকন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নেত্রী শিরিন সুলতানা, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ও ছাত্রলীগ (ডেমোক্রেটিক লীগ) সাইফুদ্দিন আহমদ মনি দৈনিক দিনকালকে পৃথক পৃথকভাবে জানান যে, ’৯০-এ ছাত্র-জনতা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল আন্দোলনের মাধ্যমে তার ফসল আজ ধূলিস্যাৎ। তাই নতুন করে আবার স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সেই আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে কতিপয় বিপথগামী সৈনিকের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর জানাজার নামাজে লাখ লাখ মানুষের শামিলের দৃশ্য দেখে সারা পৃথিবী স্তম্ভিত হয়েছিল। ঢালাও জাতীয়করণের বিপরীতে মুক্তবাজার অর্থনীতি, একদলীয় শাসনের (বাকশালী) বদলে বহুদলীয় রাজনীতি, মাত্র ৪টি দৈনিক তাও সরকারি মালিকানায় রাখার পরিবর্তে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সৃষ্টি হয়। এই সময়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকা সেই উন্নয়নের ধারাকে স্তম্ভিত করার চেষ্টা হয়। কিন্তু জনগণ প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে রায় দেয়। বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে এক কোটির বেশি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু তৎকালীন সেনা প্রধান এইচএম এরশাদ বিদেশী মদদে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বন্দুকের নলের মুখে বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। দেশে দ্বিতীয় দফার মতো সামরিক শাসন জারি হয়। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বন্ধ করে এক স্বৈরশাসন কায়েম করা হয়। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিবিসিকে দেয়া তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন “আই এ্যাম নট্ আন-হ্যাপী (আমি অসুখী নই)। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেছিলেন তাৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার মুশতাক আহমাদ। : স্বৈরাচার পতনে যাদের ভূমিকা : সেনা প্রধানের এরশাদ-গং এর ক্ষমতা দখলের পরপরই প্রতিবাদ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে মিছিল বের হয়। যদিও ছাত্র-মিছিলের ওপর পুলিশের ট্রাক উঠিয়ে, কখনো গুলি বর্ষণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই স্বৈরাচার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন হয়। এরশাদ সংসদ নির্বাচনের নামে প্রহসন সৃষ্টি করেন। একটি রাজনৈতিক দল গড়েন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। বিএনপি এই সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তা ভেঙে দেয়ার দাবি জানাতে থাকে। জনগণের ব্যাপক সমর্থনের প্রেক্ষিতে সেই সংসদ ভেঙে দিতে এরশাদ বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, ’৮৬-এর সংসদ ভেঙে দেয়ার আগে আওয়ামী লীগ ওই নিন্দিত সংসদ থেকে পদত্যাগেও ব্যর্থ হয়। যদিও ছোট ছোট কিছু রাজনৈতিক দল পদত্যাগ করে জনতার আন্দোলনে শামিল হয়। এর পরে স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভিপি আমানুল্লাহ আমান ও জিএস খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে ডাকসুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ (জাসদ) ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো এক অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে তোলে। ১৯৯০-এর ১০ অক্টোবর ছাত্র আন্দোলনে শামিল হয়ে সিরাজগঞ্জের ছাত্রদল নেতা জেহাদ নিহত হন। ঢাকার মতিঝিলে এই ঘটনা ঘটে। জেহাদের লাশ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের আহবানে সাড়া দিয়ে তৎকালীন ৭ দলীয় জোট নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেহাদের লাশ ছুয়ে শপথ নেন স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলবে। এর পর তৎকালীন পনের দলীয় ঐক্যজোটের নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও অনুরূপভাবে শপথ নেন। কিন্তু একটি সেøাগান (জয়বাংলা) কে কেন্দ্র করে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়। পরে নতুন করে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। তবে ২৭ নভেম্বর ডা. মিলন হত্যাকাে র পর সরকারের ভিত্তি নড়ে যায়। পরে ৬ ডিসেম্বর পতন ঘটে স্বৈরাচারী এরশাদের। : নতুন করে স্বৈরাচার বিরোধী শপথ চাই – আমান : এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ’৯০-এর সাবেক ছাত্র নেতৃবৃন্দ। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আমানুল্লাহ আমান গতকাল মঙ্গলবার বলেন, স্বৈরাচারের পতনের জন্য অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়েছে। জীবন দিতে হয়েছে। রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে ছাত্র-জনতার রক্তে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এসব হয়েছিল। কিন্তু আজ সেই গণতন্ত্র কই। আজ গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। সাংবিধানিক অধিকার থেকে মানুষ বঞ্চিত। সেই অধিকার ফিরিয়ে আনতে নব্য স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে হবে। নিতে হবে নতুন করে শপথ। : নতুন স্বৈরাচার এসেছে – খোকন : ডাকসুর তৎকালীন জিএস খায়রুল কবির খোকন গতকাল বলেন, আজ মামলা-হামলায় গণতান্ত্রিক অধিকার উধাও। ’৯০-এ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল থেকে মানুষ বঞ্চিত। ’৯০-এ যে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল; তা আজ নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয়েছে। এই নব্য স্বৈরাচারের পতন না হলে গণতন্ত্রের স্বাদ থেকে মানুষ বঞ্চিত থাকবে। তিনি বলেন, ’৯০-এ সকল ছাত্রসংগঠন মিলেমিশে কাজ করেছে। তারা গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল। এখনকার ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি আহবান থাকবে Ñ নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুলুন। মানুষ আপনাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। : ছাত্রীদের অবদান ছিল Ñ শিরিন : ’৯০-এর ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া হলের ছাত্রীদের লাঠি মিছিলের কথা এখানে স্মরণ করা হয় Ñ যার নেতৃত্বে ছিলেন ওই হলের নেত্রী শিরিন সুলতানা। গতকাল মঙ্গলবার তিনি দৈনিক দিনকালকে বলেন, স্বৈরাচারের পতনে ছাত্রীদের ভূমিকা বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে স্মরণীয় থাকবে। তারা সেদিন তাদের ভাইদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ এই আন্দোলনে গতি দিয়েছিল। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি। : বেগম খালেদা জিয়ার উদার আহবান স্মরণীয় Ñ সাইফুদ্দিন মনি : ডেমোক্রেটিক লীগের ছাত্র সংগঠনের নেতা সাইফুদ্দিন আহমদ মনি ’৯০-এর ছাত্র আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদাত্ত আহবানে সেদিন সকল ছাত্র সংগঠন স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে ঐক্যবদ্ধ ছিল। নতুন করে যে স্বৈরাচার আজ জনগণের অধিকার দাবিয়ে রেখেছে তা ছিনিয়ে আনতে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, দেশনেত্রী সেদিন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যে উদার নীতি নিয়েছিলেন তা আজো স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। : সকল ছাত্র সংগঠন এককাতারে এসেছিল Ñ মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল : বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল (বর্তমানে জামালপুরের বিএনপি নেতা) গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসকাবে বলেন, ’৯০-এর ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সকল ছাত্র সংগঠন এক কাতারে এসেছিলÑ যাকে ঐতিহাসিক বলতে হবে। গতকাল এই আলাপ চলাকালে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম কুমার উকিল জাতীয় প্রেসকাবের উপরতলা থেকে নামছিলেন। তারা সৌজন্যতা বিনিময়ও করেন। জনাব বাবুল জানান যে, অসীম কুমার উকিল ’৯০-এর সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের একজন সক্রিয় নেতা। তিনি তখন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। অসীম কুমার উকিল জানান যে, ৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে এটিএন বাংলায় তার একটি রেকর্ডিং রয়েছে।

Leave a Reply