আনিসুল হকের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

জাতীয়

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের প্রতি শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমাবেদনা প্রকাশ করে সান্ত্বনা দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন।

এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হককে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে তার বনানীর বাসায় গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর বেলা পৌনে ২টার দিকে বনানীর ২৭ নম্বরের বাসায় এসে পৌঁছায়।

এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হকের মরদেহবাহী বিমান ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। বিমানবন্দর থেকে বনানীর বাসায় নেওয়া হয়।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকায় হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।

এ সময় সেখানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হকের ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল শফিউল হক উপস্থিত ছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে আনিসুল হকের মরদেহ তার বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। শেষবারের মতো আনিসুল হক নিজের বাসভবনে পৌঁছালে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের তৈরি হয়। বাড়ির বাইরে প্রচুর সাধারণ মানুষ জড়ো হয়েছেন তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য।

এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মেয়রের লাশ বহনকারী যাত্রীবাহী বিমানটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্টেশন ম্যানেজার জিল্লুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ওই ফ্লাইটেই আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক এবং একজন নাতনি রয়েছেন বলে বাংলাদেশ বিমানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার লাশ বেলা ৩টা থেকে আর্মি স্টেডিয়ামে রাখা হবে। সেখানেই বিকেল ৪টায় আসরের নামাজের পর মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হবে।

এ দিকে মেয়রের মৃত্যুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত তিন দিনের শোক পালন চলছে। রোববার বন্ধ থাকবে ডিএনসিসির অফিসও।

মেয়র আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে (লন্ডনের স্থানীয় সময় ৪টা ২৩ মিনিট) লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে তিনি মারা করেন। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাসপাতাল থেকে তার লাশ বের করা হয়। বাদ জুমা লন্ডনের রিজেন্ট সেন্ট্রাল পার্ক মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় মেয়রের প্রথম নামাজে জানাজা। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশীরা তার নামাজে জানাজায় শরিক হন।

ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এ এস এম মামুন জানিয়েছিন, শনিবার বেলা ১টা ২০ মিনিটে মেয়রের লাশ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে তার ছোট ভাই সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, আত্মীয়স্বজন ও ডিএনসিসির কর্মকর্তারা লাশ গ্রহণ করবেন।

সেখান থেকে তাকে বনানীর বাসভবনে নেয়া হয়েছে। পরে আর্মি স্টেডিয়ামে বাদ আসর নামাজে জানাজা হবে। সেখানেই বেলা ৩টা থেকে সর্বসাধারণ মেয়রকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। পরে বনানীতে তাকে দাফন করা হবে।

মেয়র আনিসুল হক স্মরণে শুক্রবার ডিএনসিসির নগর ভবনসহ ৫টি অঞ্চলে একযোগে শোক বই খোলা হয়েছে। নগরবাসী তাকে স্মরণ করে এসব বইয়ে শোকবার্তা দিচ্ছেন। এ ছাড়া মেয়রের মৃত্যুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত তিন দিনের শোক পালন করছে। আগামীকাল রোববার বন্ধ থাকবে ডিএনসিসির অফিস।

গত ২৯ জুলাই নাতির জন্ম উপলে ব্যক্তিগত সফরে সপরিবারে যুক্তরাজ্য যান আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ আগস্ট তাকে লন্ডনের ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা।

পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটলে তাকে গত ৩১ অক্টোবর আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। গত সোমবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে ফের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার তিনি মারা যান।

মায়ের পাশেই শায়িত হবেন আনিসুল হক : মা, শাশুড়ি ও ছোট ছেলে মো: শারাফুল হকের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক। বিষয়টি জানিয়েছেন ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এ এস এম মামুন।

ফিরে দেখা মেয়র আনিসুল হকের জীবন
আনিসুল হকের জন্ম চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালি জেলায় ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর। তার শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটে তার নানাবাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে একই বিষয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন আনিসুল হক।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনও করেছিলেন তিনি।

তবে পরে টেলিভিশনের পর্দায় মানুষ তাকে বেশি দেখেছিল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই। ২০০৫-০৬ সালে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সালে তিনি হন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতি।

মেয়র নির্বাচনে মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিসুল হক নিজের হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন, তার নিজের কোনো গাড়ি কিংবা বাড়ি নেই; যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার খোরাক ‍যুগিয়েছিল।

টিভি উপস্থাপনা থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে ২০১৫ সালে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নগরকর্তার দায়িত্ব নেন আনিসুল হক।

মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে (তাকে মেয়র পদে সমর্থন) রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের এক সম্মিলন হল।

নিজের নির্বাচনী ইশতেহারে আনিসুল রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ‘স্মার্ট’ নগরী হিসাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনেকটা সে পথেই এগুচ্ছিলেন তিনি।

হঠাৎ শরীরে মরণব্যাধি বাসা বাঁধে। দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

গত ৪ অগাস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তির পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল আনিসুল হককে।

অবস্থার উন্নতি ঘটার পর গত ৩১ অক্টোবর তাকে আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশনে স্থানান্তরের খবর জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

তার এক মাসের মধ্যে ফের আইসিইউতে নেওয়া হল ৬৫ বছর বয়সী আনিসুল হককে।

নাতির জন্ম উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই সপরিবারে লন্ডনে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আনিসুল হক।

অসুস্থ বোধ করায় অাগস্টের মাঝামাঝিতে লন্ডনের একটি হাসপাতালে গেলে সেখানে পরীক্ষা চলার মধ্যেই সংজ্ঞা হারান তিনি। পরে তার মস্তিস্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত সেরিব্রাল ভাসকুলাইটিস শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা।

তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী আনিসুল হক ২০১৫ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তিনি এফবিসিসিআইর সভাপতি ছিলেন। তার আগে বিজিএমইএর সভাপতিও ছিলেন তিনি।

Leave a Reply