খালেদা সব কিছুতে ব্যর্থ, অঝোরে কাঁদলেন কিন্তু বাড়ি রাখতে পারলেন না : প্রধানমন্ত্রী

রাজনীতি

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যকে ধর্তব্যের মধ্যে নেন না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সব কিছুতে ব্যর্থ। সফলতা তো তার জীবনে নেই। তাই তিনি সব সময় সবকিছুতে কেবল ব্যর্থতাই দেখবেন। বিএনপি-জামায়াতের লক্ষ্যই হচ্ছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা।

বুধবার বিকেলে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন নেছা বাপ্পির সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

খালেদা জিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও সেখানে দেওয়া সরকারের ব্যর্থতা সংক্রান্ত বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামে তো একটা কথা প্রচলিত আছে,’পাগলে কী না কয়, ছাগলে কি না খায়!’ এখন চক্ষু থাকতে যে অন্ধ তাকে দেখাবে কে? দেখেও যে দেখতে পারে না, তাকে দেখাবার কিছু নেই। এটা হচ্ছে একটা অনুভূতির ব্যাপার, এটা হচ্ছে একটা বোধ। বোধটা আছে কি না সেটাই ব্যাপার। তিনি (খালেদা জিয়া) সেখানে গেলেন, যেভাবে সাজসজ্জা নিয়ে ঢোলডগর, হাতি ঘোড়া সবই নিয়ে গেলেন। তাতে উনি কোনো দুর্গত মানুষকে দেখতে গেলেন, না সেখানে কোনো বরযাত্রী হিসেবে গেলেন, কি হিসেবে গেলেন? সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য না। উনি মনে হচ্ছে একটা শোডাউন করা, গাড়ি দেখানোর উপরই মনে হয় তাদের দৃষ্টিটা বেশি ছিল। কারণ এটা তো বাস্তবতা মানবিক কারণে এদের সহযোগিতা করার পদক্ষেপ নেওয়ার অভ্যাস তো তাদের নেই।

এসময় প্রধানমন্ত্রী অতীতে রোহিঙ্গা আসার ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৯৯১ সালে আরেকবার এভাবে রোহিঙ্গারা স্রোতের মত বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। আমরা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তখন সেখানে গিয়েছিলাম তাদের অবস্থা নিজের চোখে দেখেছি। তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেখানে পৌঁছার আগেই আমরা গেছি। আওয়ামী লীগ সব সময় একটা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এটা আমাদের রাজনীতিরই একটা অঙ্গীকার। আমরা এই আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করি। তারা (বিএনপি) যতোটা লোক দেখানোর জন্য করে আন্তরিকতার সঙ্গে ততোটা করে না। এটা সবাই জানে, বোঝে।

এ সময় খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, উনি তো ব্যর্থতা দেখছেন, কারণ যে নিজে সব কাজেই ব্যর্থ হয় সেতো ব্যর্থতা দেখবে! ব্যর্থতা ছাড়া সফলতা দেখার মানসিকতা তো তার নেই। নির্বাচন ঠেকাতে চেয়েছিল, পারে নাই। মানুষ পুঁড়িয়ে হত্যা করেছিল জনগণ সেটা ঠেকিয়ে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ভোট চুরি করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল থাকতে পারে নাই। দেড় মাসের মাথায় পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে বিতাড়িত করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, বহু ব্যর্থতার ইতিহাস তার আছে। ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটা দখল করে রেখেছিলেন। কিছু নিয়ম-কানুন আইন ভঙ্গ করার কারণে যখন প্রশ্নটা উঠলো, তখন তিনি নিজেই মামলা করলেন। আর মামলা করেই ফেঁসে গেলেন। মামলা করে বাড়িও হারালেন। অঝোর ধারায় কাঁদলেন, কেঁদে আকুল হলেন। কিন্তু বাড়ি আর রাখতে পারলেন না। এই রোহিঙ্গা সমস্যা তাদেরই সৃষ্টি, তার স্বামী (জিয়াউর রহমান) এই সমস্যা সৃষ্টি করে গেছেন। কাজেই বিএনপি সব ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়।

‘বিএনপি-জামায়াতের লক্ষ্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা’–একথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘোলা পানিতে কিভাবে মৎস্য শিকার করবে, এই তালেই তারা ব্যস্ত থাকে। মানবিক কোনো গুণাবলি তাদের মধ্যে নেই। এটাই হলো বাস্তবতা। কাজেই তার বক্তব্যকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে নিই না। আমার নীতি-আদর্শ থেকে আমরা সবকিছু মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করি। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা (বিএনপি-জামায়াত) মানুষ পুড়িয়ে মারে, তাদের কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। আমরা আমাদের কাজ করে যাবো।

মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মতিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসহায় রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা ও তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন সঙ্কটের মুখোমুখি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে এ সমস্যা সমাধানে সফল হবো। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সে দেশকে করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ওই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা আরো বলেন, ‘মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সামরিক অভিযান ও সহিংসতার প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। দুই মাস সময়ের মধ্যে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছে।’

বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে তাদের ফিরিয়ে নিতে মায়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও কর্মতৎপরতায় মায়ানমারের জাতিগত নিধন বন্ধের দাবিটি আজ সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছে, তা আওয়ামী লীগ সরকারের জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই ফসল।’

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াটা বাংলাদেশের সময়োযোগী সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের নাম আজ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কণ্ঠে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে এ সমস্যার সমাধানে সফল হবো।’

ব্যক্তি জীবনে নিজেও শরণার্থী হিসেবে বসবাসের কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, ‘জাতির পিতাসহ পরিবারের সব সদস্যকে হত্যার পর প্রায় ৬ বছর আমি ও আমার ছোট বোন শরণার্থী জীবন-যাপন করেছি। সে কারণে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সেই অনুভূতি আমাদের মাঝে কাজ করেছে।’

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির প্রশ্নের জবাবে গত ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এ সময় আমি আমার পাঁচ দফা প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে তার সহযোগিতা কামনা করি। এ সমস্যার উৎপত্তি মায়ানমারে হওযায় মায়ানমারকেই এ সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এ লক্ষ্যে অতিসত্ত্বর সব বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিককে নিরাপদে ও সসম্মানে স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে বলে আমি তাকে দৃঢ়ভাবে জানাই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন অর্জনের স্বীকৃতি এবং সফলতার কারণে এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সনদ পেয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া কোনো দলই এত পুরস্কার পায়নি।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যতবারই ক্ষমতায় এসছে ততবারই শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছে। মিলেছে একের পর এক সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার। শুধুমাত্র বিগত আট বছরেই নয় ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদসহ আমরা (সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এ গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সনদ পেয়েছি।

তালিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৩টি ডিগ্রি পেয়েছেন। আর তিনি ও তার সরকার অ্যাওয়ার্ড পায় ২৭টি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব অর্জনই দেশের মানুষের। আগামী দিনগুলোতেও দেশের মানুয়ের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাব। আন্তর্জাতিক এ পুরস্কারগুলো আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাবে।

এর আগে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ একটি সম্মানজনক ও উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য এখন সর্বজনবিদিত। বিগত আট বছরে সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব, দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে দেশ আজ বিশ্বশান্তি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠায় বিগত যে কোনো সময় থেকে একটি সফল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

Leave a Reply