সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় মালয়েশিয়াও

রাজনীতি

মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।

বুধবার বিকেল সাড়ে ৪ টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমনওয়েলথ ওমেন পার্লামেন্টারিয়ানের চেয়ারপারসন ড. নুরানী আহমেদ এমপির নেতৃত্বে ৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন ডব্লিউ বি শামসুল এস্কান্দার মোহাম্মদ আকিল এমপি ও দাতু নূরমালা আব্দুল সামাদ এমপি।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, মালয়েশিয়া বিএনপির সহ-সভাপতি মাহবুব আলম শাহ।

বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের মধ্যে আলোচনা প্রাণবন্ত হয়েছে। মালয়েশিয়ান প্রতিনিধিরা ‘তাদের দেশে গণতন্ত্রের যে চর্চা আছে একইভাবে বাংলাদেশেও তার প্রতিফলন দেখতে চান’।

মালয়েশিয়া আগামীতে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় বলেও জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল।

কূটনীতিকদের দৌঁড়ঝাঁপ, অন্তরালে নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রশ্নে চলছে দেনদরবার!
আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের দৌঁড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায়। নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর এবার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসতে শুরু করেছেন পশ্চিমা কূনীতিকরা।

এরইমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে বিদেশি কূটনীতিকরা। এসব বৈঠক থেকে আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে।

সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নির্বাচন কমিশনের সংলাপের পর নতুন করে শুরু হয় ঢাকার কূটনীতিকদের নড়াচড়া। বিভন্ন কৌশলে নিজেদের মধ্যে এবং সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের হাইকমান্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন কূটনীতিকরা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের আগেও এমন দৌঁড়ঝাঁপ করেছিলেন তারা। নির্বাচন সামনে রেখে ফের বিদেশি কূটনীতিকদের নড়াচড়া বেড়ে যাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ননা গুঞ্জন চাউর হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা ধরনের প্রশ্ন। এ নিয়ে রাজনীতির অন্ধরমহলেও শুরু হয়েছে রাজনীতির নানা হিসেব-নিকাশ।

বাংলাদেশে ইতিবাচক রাজনীতির পরিবেশ ফেরাতে পর্দার অন্তরালে থেকেই দূতিয়ালি করছেন কূটনীতিকরা। নির্বাচনকেন্দ্রিক ‘সহিংসতার চক্র’ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত হতে সহায়তা করা, একটি বিতর্কমুক্ত এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন নিশ্চিত করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য বলে জানা যাচ্ছে।

তাদের তৎরপরতা কিছুটা দৃশ্যমানও হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কূটনীতিকদের আনাগোনা, দফায় দফায় বৈঠক-আলোচনা চলছে। সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয় নির্বাচন।

গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকায় হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তাদের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৪৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দুপক্ষের মধ্যে কথাবার্তা হয়।

বৈঠকের পর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতও যে চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরম্পরা অক্ষুণ্ণ থাক এবং সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন সম্পাদিত হোক, স্বরাজ আলোচনায় সে কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

ওই বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধিদলে খালেদা জিয়া ছাড়াও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ছাড়াও পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ও মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন।

বৈঠকের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচনের বিষয়টি খালেদা জিয়া বৈঠকে তুলে ধরেছেন এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেগুলো শুনেছেন।’

‘তিনি (সুষমা স্বরাজ) আমাদের বলেছেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত প্রত্যাশা করে তার প্রতিবেশী দেশগুলোতেও যাতে গণতন্ত্র বজায় থাকে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হয় এবং নির্বাচন কমিশনও যাতে স্বাধীন ভাবে কাজ করে।’

এদিকে এই বৈঠকের আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্টমন্ত্রীসহ অন্যান্য কূটনীতিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফরের পর বেগম জিয়ার ধারাবাহিক বৈঠক করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী কূটনীতিকরা।

সোমবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে কানাডিয়ান পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশে আগামীতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এর আগে সোমবার সকালে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস শ্যাননের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিউদ্দিন আহমেদ এবং বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন।

থমাস শ্যাননের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া ব্লুম বার্নিকাটসহ ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘শ্যাননের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করছে। তারা সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলেছে। আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি এবং রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে।’ নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কথা হয়েছে, কিন্তু বলা যাবে না।’

এছাড়াও এর আগে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করে আগামী নির্বাচন নিয়ে একই ধরনের কথা বলেছেন।

এদিক থেকে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে ততই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব বোঝার চেষ্টা করবে কূটনীতিকরা। কারণ রাজনীতির হিসেব-নিকেশ সেটিই ইঙ্গিত করছে বলে তাদের ধারণা।

এদিকে বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানিয়েছে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সিপিএ সম্মেলনেও বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়েও কথা হয়েছে।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রাসেলসে এক বৈঠকে নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় ইইউ। এ প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ধারবাহিক বৈঠক করছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, নির্বাচন প্রশ্নে সরকার আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয়। ২০১৪ সালের আদলে আরেকটি নির্বাচন না করার পক্ষে সরকারের ভেতরেও আলোচনা চলছে।

এদিকে পশ্চিমা এক প্রভাবশালী কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কী ঘটছে তা বিদেশি কূটনীতিক এবং মিশনগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের এই যুগে এক দেশের ঘটনা অন্য দেশে মুহূর্তেই খবর হয়। সেই ঘটনাগুলোর নানামুখী প্রভাবও রয়েছে। এসব কারণে এক দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর অন্য দেশের পর্যবেক্ষণ থাকে। বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র।

এখানকার রাজনীতি, অর্থনীতি বিশেষত শান্তি ও স্থিতিশীলতার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বৈশ্বিক ব্যবস্থায়। ঠিক তেমনি এখানকার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলো বিশেষ করে ‘অশান্তি এবং অস্থিতিশীলতায়’ বিশ্ব শান্তিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই দেখতে চায় বিশ্ব সম্প্রদায়।

এখানে অতীতে যে প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে তার প্রসঙ্গ টেনে পশ্চিমা ওই উন্নয়ন সহযোগী বলেন, এখানে আমি বা আমার সহকর্মীরা যা করছি তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং পরোক্ষভাবে বিশ্ব শান্তি এবং স্থিতিশীলতার লক্ষ্যেই করা হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ এবং সহিংসতামুক্ত পরিবেশে আয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply