খালেদার গাড়িবহরে হামলা : দুই হাজারীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে আ,লীগে অস্বস্তি

রাজনীতি

ফেনীতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা নিয়ে জয়নাল হাজারী ও নিজাম হাজারী পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ফের প্রকাশ্য রূপ নিল। তাদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য নিয়ে জনমনে এক ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগ ঘরণার লোকজনের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। ফলে এ নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়েও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

গত শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কক্সবাজার সফরে যাওয়ার পথে গাড়িবহরে হামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি পরস্পরকে দোষারোপের মধ্যেই চাঞ্চল্যকর ভিডিও প্রকাশ করে এ হামলায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী।

তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, এ হামলার পেছনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত। ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর নির্দেশে দলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে।

জয়নাল হাজারীর স্থানীয় দৈনিক হাজারিকা প্রতিদিনের অনলাইন সংস্করণে ‘কাদের সাহেব, প্রমাণ চান? তাহলে নিজামের ভিডিওটি দেখুন’ শিরোনামে লেখা একটি কলামে জয়নাল হাজারী এসব কথা লিখেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনার জন্য বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী বলেছেন, ‘সরকারের তরফ থেকে যদি কোনো নির্দেশনা থাকত তাহলে বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না।’

বুধবার ফেনীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নিজাম উদ্দিন হাজারী।

নিজাম উদ্দিন হাজারী বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে যারাই সম্পৃক্ত সে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ না বিএনপি, ছাত্রদল এটা দেখার বিষয় না। এদের অবশ্যই বিচার হওয়া প্রয়োজন। সে যেই হোক। কারণ আজ যদি তারা প্রশ্রয় পায়, আগামী দিনে তারা আমাদের নেত্রীর ওপর হামলা করতে দ্বিধাবোধ করবে না।’

নিজাম উদ্দিন হাজারী আরো বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

নিজাম উদ্দিন হাজারী উল্লেখ করেন, বিএনপি নিজেদের কোন্দল ঢাকার জন্য হামলা চালিয়ে সরকারি দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। যা সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ধামাচাপা দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। তিনি বলেন, ‘কোনো অবস্থাতে শান্ত ফেনীকে অশান্ত করতে দেওয়া হবে না।’

গত শনিবার চার দিনের সফরে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রওনা দেন খালেদা জিয়া। বিকেলে ফেনী শহরের কাছে মোহাম্মদ আল বাজার পার হওয়ার সময় একদল মানুষ গাড়িবহরের ওপর হামলা চালায়।

এ সময় ওই ব্যক্তিরা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই, ডিবিসি, একাত্তর ও বৈশাখী টেলিভিশনের গাড়িসহ বেশকিছু যানবাহনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ওই দিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাইতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে থাকা এনটিভির গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার জন্য বিএনপি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করে। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরেই এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুই পক্ষই সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অভিযোগ জানিয়েছে।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ফের ফেনীতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের পেছনে দুটি বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। মুহূর্তে দুটি বাসে আগুন ধরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। এর আগেই বাস থেকে নেমে যান যাত্রীরা। এছাড়া সেখানে বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে।

এ ঘটনায় বুধবার পুলিশের দায়ের করা মামলায় উল্টো বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ৭০জন নেতাকে আসামী করা হয়েছে।

এর আগে জয়নাল হাজারীর স্থানীয় দৈনিক হাজারিকা প্রতিদিনের অনলাইন সংস্করণে ‘কাদের সাহেব, প্রমাণ চান? তাহলে নিজামের ভিডিওটি দেখুন’ শিরোনামে লেখা একটি কলামে জয়নাল হাজারী লিখেছেন এ হামলার পেছনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত। ফেনীর সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর নির্দেশে দলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে।

হাজারিকা প্রতিদিনে জয়নাল হাজারীর লেখা সেই কলামটি নিম্নে আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

গত শনিবারে রোহিঙ্গাদের সরেজমিনে দেখার জন্য খালেদা জিয়া উখিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। যাওয়ার পথে তার গাড়িবহরে হামলা হয়েছে । এতে অনেক গাড়ি ভাংচুরের কবলে পড়েছে। বেশ কিছু বিএনপি নেতাকর্মী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে সাংবাদিক ছিল অনেক। হামলার খবরটি ছড়িয়ে পড়লে প্রাথমিকভাবে ওবায়দুল কাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন এটি বিএনপির আভ্যন্তরিন কোন্দল। এ কথা বলে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে সারাদেশেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

এই প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ ছিল খালেদা জিয়ার নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে। এদিকে ভারতীয় মন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে খালেদা জিয়া কথা দিয়েছিলেন পরিবেশ থাকলে নিশ্চয়ই নির্বাচনে যাব। অপরদিকে খালেদা জিয়া দেশে ফিরলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এমন আশঙ্কা নিয়ে খালেদা দেশে এসেছেন এবং বিমান বন্দর থেকে খালেদার বাসভবন পর্যন্ত কোন টু-শব্দ হয়নি। বিএনপি নেতাকর্মীরাও ব্যাপকভাবে জড়ো হয়েছিল পুলিশ কিংবা আ.লীগ নেতাকর্মীরা কোন প্রকার অপতৎপরতা করেনি। এটাকে দেশবাসী পজেটিভভাবে নিয়েছিল এবং নির্বাচনের ব্যাপারেও খানিকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল কিন্তু ফেনীর ঘটনাটি হঠাৎ করে পুরো ব্যাপারটাকে ওলোটপালট করে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে ওবায়দুল কাদের ছাড়া আর কেউ কোন মন্তব্য করেননি। নেতাকর্মীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব জানা গেছে। তিনি বিষয়টাকে ভালভাবে নেননি। তাই সঙ্গে সঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলে দিলেন খালেদার বহরে হামলাকারীরা দেশের শত্রু, দলের শত্রু। তদন্ত করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একইভাবে আ.লীগ নেতা হানিফও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কোন প্রতিক্রিয়া দেননি। বিএনপির পক্ষ থেকে দেশ বিদেশের সকল মিত্রকে জানানো হয়েছে। সুষমা স্বরাজও এতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এটা একেবারেই সত্য যে আ.লীগের এমপি-মন্ত্রীরা যারা বিএনপি নির্বাচনে এলে ভোটে জয়লাভ করতে পারবে না তারা সবাই কঠোরভাবে বিএনপিকে ভোটের বাহিরে রাখতে চায়।

বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে যত রকম তৎপরতা দরকার ওরা তার সবটাই করবে এটাই বোঝা যায়। এদিকে বিএনপি নির্বাচনে এলে ওবায়দুল কাদেরকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের সঙ্গে ভোট করতে হবে আর তখন ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে জয়লাভ করা ঝুকিপূর্ণ হয়ে যাবে । এভাবে অনেক মন্ত্রী এবং এমপিরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবেন। ফেনীর বর্তমান বিনা ভোটের এমপি নিজাম ভোট করেনি। দলীয় পদটি দখল করার সময়ও ভোট করেনি। ভোট করে নেতা হওয়া তার পছন্দ নয়।

বিএনপি ভোট করলে ফেনীতে আ.লীগ প্রার্থীকে ভোট করতে হবে ভিপি জয়নালের সঙ্গে, ফলে পরিস্থিতি কি দাঁড়ায় তা বলা মুশকিল। তাই খালেদাকে ভোট থেকে দূরে রাখার আঘাতটি ফেনী থেকেই শুরু হয়েছে। কিছুটা মনে হয় বর্তমান সময়ে নেত্রী এসব অপতৎপরতার পক্ষে নয়। প্রকাশ আছে নির্বাচনে সরকারের পক্ষ থেকে কোন কারচুপির আশ্রয় নেয়া হবে না।

দু-পক্ষের পক্ষ থেকে আশ্বাস পেয়ে সুষমা স্বরাজ খুশি মনেই দেশে ফিরে গেছেন। খালেদা যদি কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে কোথাও যেতেন সেক্ষেত্রে কিছুটা ঝুট-ঝামেলাকে মেনে নেয়া যায় কিন্তু সকল বিবেকবান মানুষ যখন মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং খালেদা জিয়াও তাতে সাড়া দিয়েছেন তখনি তার উপর এই হামলা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিবেকবান মানুষেরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন।

এদিকে নিজাম একটি ভিডিও বার্তায় পরিষ্কার বলেছে- কেন্দ্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এই ঘটনার জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং কেন্দ্রের নির্দেশেই আমি এটা করেছি। নিজামের যেসব কর্মীরা এই ঘটনায় জড়িত ছিল তাদের প্রত্যেকে বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছে। বিভিন্ন শাখার পদবিওয়ালা যেসব কর্মীরা ঘটনাটি করেছে তাদের নাম পদবিসহ দেশের পত্র-পত্রিকায় ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এতে যারা এটা করেছে যার নির্দেশে এটা করেছে তা একেবারেই আয়নার মত পরিষ্কার । নিজামের ভিডিও বার্তাটির পরে এসবি-ডিএসবি-ডিজিএফাই কাউকে কষ্ট করে কিছুই তদন্ত করতে হবে না। যারা এটা করেছে তারা নিজেরাই স্পষ্ট স্বীকার করেছে।

এই মূহূর্তে কাদের সাহেব বলেছেন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাই তাকে অনুরোধ করছি নিজামের দেয়া ভিডিও বার্তাটি দেখুন। তারপর আর কারও কোন কিছুই তদন্তের দরকার হবে না। ইতিমধ্যে ভিডিওটি ফেসবুকের মাধ্যমে সারাদেশে ভাইরাল হয়ে গেছে। এখন জনগণ দেখতে চায় নির্বাচন বিরোধী এই অপতৎপরতার ব্যাপারে সরকার কি ব্যবস্থা নেয়। সরকার যদি ব্যবস্থা নেয় তাহলে জনগণ আশাবাদী হবে নতুবা আবার চরম হতাশায় নিমজ্জিত হবে।

ফেনীতে খালেদার বহরে হামলার ব্যাপারে নিজাম যে ভিডিও বার্তাটি দিয়েছে তা আমরা সরাসরি যুক্ত করে দিলাম।

কে এই জয়নাল হাজারী?
জয়নাল হাজারীর শাসনামলে ফেনীকে বলা হতো মৃত্যু উপত্যকা। এককভাবে পুরো ফেনীকে নিয়ন্ত্রণ করতেন ফেনী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী। ‘এক নেতা এক জেলা’- প্রবাদই চালু ছিল হাজারীর শাসনামলে।

‘ফেনীর মুকুটহীন সম্রাট’ ও ‘গডফাদার’ খেতাব জড়িয়ে ছিল জয়নাল হাজারীর নামের সঙ্গে। প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় ছিল জয়নাল হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটি। জেলাজুড়েই ছিল তার একক নিয়ন্ত্রণ।

সময়ের পরিবর্তনে ফেনীতে জয়নাল হাজারী অধ্যায়ের অবসান হয়। কিন্তু জয়নাল হাজারীর যুগে তৈরি হওয়া আতঙ্ক এখনো যেন নিত্যসঙ্গী ফেনীবাসীর। কারণ, আরেক হাজারীর শাসন এখন ফেনীতে। বর্তমান সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে পুরো ফেনী জেলা। এ যেন ফেনীবাসীর ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত উনুনে পড়ারই অবস্থা। যেন ছাড়ছেই না হাজারীর ফের।

প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে জয়নাল হাজারী কখনও লড়েছেন জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাফর ইমাম এবং তার টাইগার বাহিনীর বিরুদ্ধে। কখনও বিএনপি ও অধ্যাপক জযনাল আবদীনের (ভিপি জয়নালে) বাহিনীর বিরুদ্ধে।

২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ অভিযানের মুখে জয়নাল হাজারী ফেনী ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। কিন্তু তখন ভারত থেকেই পুরো ফেনীকে নিয়ন্ত্রণ করতেন জয়নাল হাজারী।

জয়নাল হাজারীর হাতের মুঠোয় আওয়ামী লীগ এতটাই ভরা ছিল যে, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল নির্বাচনেও ফেনী সদর আসনে তার পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। হাজারীর বড় বোন খোদেজা বেগমের মনোনয়ন বিস্ময় জাগিয়েছিল ফেনীর সব মহলেই। তবু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কমবেশি তা মেনেও নিয়েছিলেন। কারণ, তখন ভারতে অবস্থান করেও দলকে নিয়ন্ত্রণ করতেন জয়নাল হাজারীই।

ওয়ান-ইলেভেনের সময়কাল থেকে হাজারী বিরোধী একটি শক্তি ভেতরে ভেতরে হাজারীর জায়গা দখল করতে তৎপর হয়ে ওঠে।

ওয়ান-ইলেভেনের অধ্যায় শেষ হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হাজারীও দেশে ফিরে আসেন। ততদিনে ফেনী নদীর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে।

হাজারীবিরোধীরা তার এককালের সহযোগী যুবলীগ নেতা নিজাম হাজারীর সঙ্গে হাত মেলান। হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির অনেকেই হাজারীর দল থেকে ছুটে এসে নিজাম হাজারীর দলে ভেড়েন। এর মধ্যে রয়েছেন স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সচিব ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম, জেলা যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন, সাধারণ সম্পাদক শুসেন শীল, জেলা কৃষক লীগ সাধারণ সম্পাদক পৌর কাউন্সিলর আশরাফুল আলম গিটার, জয়নাল হাজারীর পিএস জয়লস্কর, ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মিলন প্রমুখ।

নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি হয় ফেনীতে। পৌর এলাকাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সময় ফেনী পৌরসভা নির্বাচনের সময় পুলিশের উপস্থিতিতে নিজাম হাজারীর প্রার্থীরা নিজাম হাজারীর প্রতীক দোয়াত-কলমে সিল মারেন।

ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে ভোটারদের মেয়র পদে সিল মারারই সুযোগ ছিলো না। কেন্দ্রের ভেতরে নিজাম হাজারীর লোকজন থাকতো। তারা ভোটারদের বলতো- ‘মেয়র পদে আপনাদের কষ্ট করে সিল মারতে হবে না, আমরাই মেরে দেবো।’

ওই নির্বাছনে নিজাম হাজারী ফেনী পৌরসভার মেয়র হলেও পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণে নেন নিজাম হাজারী ও তার লোকজন। পরে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে আরো বড় পদে আসীন করেন। পরে নিজাম উদ্দিন হাজারী হন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য। ফলে এখন পুরো জেলা তার নিয়ন্ত্রণেই চলছে।

জয়নাল হাজারীর সহযোদ্ধা থেকে যেভাবে ক্ষমতাধর নিজাম হাজারী
নিজাম হাজারী ছিলেন জয়নাল হাজারীর এক সময়ের সহচর। নিজাম হাজারীর ছাত্রজীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে এক অস্ত্র মামলায় তার ১০ বছরের সাজা হয়। কয়েক বছর কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান। জয়নাল হাজারী ফেনীতে ফিরে আসার আগেই নিজাম হাজারী আওয়ামী লীগের হাজারীবিরোধীদের নিয়ে জোট গঠন করেন।

পৌর নির্বাচন এলে নিজাম হাজারী স্বঘোষিত আওয়ামী লীগের একক মেয়র প্রার্থী হন। এরপর ফেনী আওয়ামী লীগের সাধারণ সভা আহ্বান করে নিজাম হাজারীকে দলের সদস্য বানানো হয়। নিজাম হাজারীর সঙ্গে একাট্টা হয়ে ফেনী নিয়ন্ত্রণ করতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতা তার সঙ্গে যোগদান করেন। দ্রুত আবার পরিবর্তন হতে থাকে ফেনীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি। নিজাম হাজারীর সঙ্গে ওই সময় যোগ দেন যুবলীগ নেতা ও ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম, পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল মজুমদার, ছাত্রলীগ নেতা ও পরশুরাম পৌরসভা চেয়ারম্যান সাজেল চৌধুরী। এ কয়েকজন মিলে ফেনীতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

স্থানীয় জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা জানান, ফেনী শহর ও প্রতিটি উপজেলা সদর এবং গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে নিজাম হাজারীর।

জানা যায়, নিজাম হাজারী তার পাহারার জন্য একটি চৌকস প্রাইভেট বাহিনী গঠন করেছেন। নিজাম হাজারী যেখানে যান সেখানেই সুবিধামতো এ বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়ে থাকে।

ফেনীতে জালেমের শাসন চলছে: জয়নাল হাজারী
এর আগে সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী সাংবাদিকদের বলেন, ফেনীতে জালেমের শাসন চলছে। কিন্তু পত্রিকায় একলাইনও লেখা হয় না।

নিজাম হাজারী সম্পর্কে জয়নাল হাজারীর অভিযোগ, নিজাম হাজারী ফেনীবাসীকে জিম্মি করে রেখেছেন। অপরাধ জগতের শীর্ষ কয়েকজনকে নিয়ে নিজাম হাজারী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন।

সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে জয়নাল হাজারী বলেন, ‘সাংবাদিকরা এখন তার (নিজাম হাজারী) বিরুদ্ধে এক লাইন লেখেন না। ফেনীতে হাজার গুণ বেশি টেন্ডারবাজি, বালুমহাল লুট ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনও নিজাম হাজারীর এসব কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করে আছে।’

নিজাম হাজারীর বক্তব্য
জয়নাল হাজারীর বক্তব্যের জবাবে ওই সময় নিজাম উদ্দিন হাজারী তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেন। নিজাম হাজারী ফেনীকে বর্তমানে শান্তির শহর উল্লেখ করে বলেন, ‘ফেনীতে জয়নাল হাজারী আমলের মতো এখন ড্রিল মেশিন দিয়ে কাউকে হত্যা করা হয় না, একদিনে ৩৪ জন নিহত হয়নি, সকালে গোলাগুলির শব্দে মানুষের ঘুম ভাঙ্গে না।’

তিনি বলেন, ‘ফেনীতে শান্তি বিরাজ করছে, তাই কারো কারো সহ্য হচ্ছে না। ফেনীতে কোনো রাজনৈতিক খুনের ঘটনা নেই। বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয় না। শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধী দল তাদের কর্মসূচি পালন করছে যা ফেনীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।’

জয়নাল হাজারীর ফাঁস করা ভিডিওটি দেখতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

Leave a Reply